রোকসানা নিলা : কুমিল্লা নগরীর মোগলটুলী এলাকায় পুরাতন গোমতী নদীর তীরে অবস্থিত শাহ সুজা মসজিদ। এটি মোগল স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় ছেলে এবং বাংলার সুবেদার শাহ সুজার নামে ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল।
মোগল স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী শাহ সুজা মসজিদ। মসজিদটির নির্মাণকাল ১৬৫৮ সাল। বাদশাহ আওরঙ্গজেবের ভাই শাহজাদা সুজার নাম অনুসারে এটি ‘সুজা মসজিদ’ নামে পরিচিত। ৩৬৪ বছরের প্রাচীন এ মসজিদটি দেখতে প্রতিদিনই কুমিল্লা মহানগরীর মোগলটুলী এলাকায় আসেন দেশ-বিদেশের বহু দর্শনার্থীরা। মসজিদটিতে মোট তিনটি গম্বুজ রয়েছে, যার মধ্যে কেন্দ্রীয় গম্বুজটি পাশের দুটি গম্বুজের চেয়ে বড়। মসজিদের চার কোণে চারটি অষ্টকোণাকার বুরুজ রয়েছে, যেগুলোর ওপরে ছোট গম্বুজ আছে। এর পূর্ব প্রাচীরে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ প্রাচীরে একটি করে খিলানযুক্ত প্রবেশপথ আছে। প্রধান প্রবেশপথটি অপেক্ষাকৃত বড়।মসজিদের দৈর্ঘ্য ১৭.৬৮ মিটার (৫৮ ফুট) এবং প্রস্থ ৮.৫৩ মিটার (২৮ ফুট)।প্রতিদিন ভোর ৪:৩০ থেকে রাত ১০:৩০ পর্যন্ত খোলা থাকে।উত্তর-দক্ষিণে লম্বা দেওয়ালের পুরুত্ব ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। বারান্দা ২৫ ফুট। মসজিদের মূল গম্বুজ তিনটি। এতে ছোট-বড় মিনার রয়েছে ১৮টি। মসজিদের সামনের অংশে দুটি বড় মিনার রয়েছে। ২২ ফুট করে দুটি কক্ষের ওপর আছে দুটি করে আরও চারটি মিনার। শাহ সুজা মসজিদের পুরোনো স্থাপত্যশৈলী ঠিক রেখে আধুনিক কারুকাজের সমন্বয়ে সামনের অংশ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। মসজিদের উত্তর-পূর্ব কোণে একটি সুউচ্চ মিনারও নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদের প্রবেশপথটি গম্বুজের শীর্ষে পদ্মফুলের নকশা ও তার ওপরে রয়েছে কলসি। গম্বুজের চারদিকে রয়েছে পদ্ম পাপড়ির মারলন নকশা। মসজিদের ফটক ধবধবে সাদা রঙের। কেবলা প্রাচীর ও গম্বুজ, কলসি চূড়া দ্বারা সুশোভিত গম্বুজ। প্রাচীন এ মসজিদটি দেখতে মহানগরীর মোগলটুলী এলাকায় প্রতিদিনই দর্শনার্থীরা ভিড় করেন। বিশেষ করে জুমা, শবে বরাত, শবে কদরসহ বিশেষ দিনগুলোয় এখানে মুসল্লি ও দর্শনার্থীরা ভিড় জমান। মসজিদটি প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে দুই রকমের তথ্য পাওয়া যায়।তার মধ্যে প্রথমটি হলো শাহজাদা শাহ সুজা ত্রিপুরা জয় করে বিজয় চিরস্মরণীয় করার জন্য মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। দ্বিতীয়টি হলো মহারাজ গোবিন্দ মানিক্য সুজার নাম চিরস্মরণীয় করার জন্য নিমচা তরবারি ও হিরকাঙ্গুরীয়ের বিনিময়ে বহু অর্থ ব্যয় করে এ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদের খতিব মুফতি খিজির আহমদ বলেন, ‘মসজিদটিকে আরও বড়ো করা দরকার। মসজিদের ভেতরে মুসল্লিদের জন্য স্থান সংকুলান হয় না।প্রতিটি জুম্মা এবং শবে বরাত, শবে কদর নামাজ বাইরে ত্রিপল দিয়ে কষ্ট করে মুসল্লিদের নামাজ আদায় করতে হয়।
মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. আলী আশ্রাফ বলেন, এটি একটি প্রাচীন মসজিদ। এটি শুধু কুমিল্লায় নয়, সারা দেশের মধ্যে অন্যতম একটি মসজিদ। এখানে একসঙ্গে দের হাজারের বেশি মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন। মসজিদের অবকাঠামো ঠিক রেখে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে মতামত জানতে চাইলে এ মসজিদের মুসল্লি কুমিল্লা বাঁচাও মঞ্চের সদস্য সচিব নাসির উদ্দিন বলেন, প্রাচীন এ মসজিদটি বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ, এলাকাবাসীর আপত্তির কারণে এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত হয়নি, ইহা সংরক্ষণের সরকারী ও বেসকারী পর্যায়ে সকলের দায়িত্ব রয়েছে ফলে, এ মসজিদের অনেক সম্পত্তি এখন বেখদল ও অপব্যবহার হচ্ছে। তাই বেদখল সম্পত্তির উদ্ধার, এত বছর বেদখলের অর্থনৈতিক ক্ষতির বিপরীতে জড়িতদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও মসজিদের জানাযা মাঠের ছাওনি সরানোর জন্য দাবী জানান। এ ছাওনীর কারণে পুরাকীর্তিটি মানুষের চোখের আড়ালে চলে যায়।