মাহিদুল ইসলাম ফরহাদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি : চাঁপাইনবাবগঞ্জে মহামারিতে রুপ নিয়েছে হাম রোগে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা। প্রতিদিন শুধু জেলা হাসপাতালের জরুরী বিভাগে শতাধীক শিশু চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এছাড়া হাসপাতালের কিডনি ডায়ালসিস ওয়ার্ডকে অস্থায়ী আইসোলেশন ওয়ার্ড বানিয়ে সেখানে প্রায় শতাধীক রোগীকে গাদাগাদি করে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এমনকি মারাত্বক ঝঁকিপূর্ণ রোগীদের জন্য একটিও নেই আইসিইউ। শিশুদের স্বজনরা বলছেন,হাম ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় চিকিৎসকরা বাড়তি সতর্ককতা অবলম্বন করতে পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু ধারণ ক্ষমতার একটি ওয়ার্ডে কয়েকগুন রোগী ভর্তি থাকায় রোগটি ওয়ার্ড থেকেই আবারও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা। আবার অনেকে আইসোলেশন ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে সিড়ির নিচে ও বারান্দায় আশ্রয় নিয়ে ঠান্ডার মধ্যে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছে। গত ৩ মাসে শুধু জেলা হাসপাতালে হাম আক্রান্ত চারজন শিশু মৃত্যুর বিষয়টি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করলেও এর সঙ্খ্যা আরও বলছেন রোগীর স্বজনরা। এদিকে দায়িত্বরত চিকিৎসকও বলছেন-বুঝে উঠার আগেই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে চার শিশু।‘হাসপাতালে হাম রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা বাড়ছেই। চিকিৎসক ও নার্স সংকটের কারণে প্রচুর হিমশিম খেতে হচ্ছে।
জানাগেছে,শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে ১২ দিনে (১৫ থেকে ২৭ মার্চ) হাম আক্রান্ত ১৩০ রোগীকে ভর্তি নেওয়া হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে শনিবার সকাল ৬টা) অরও ৩৭ শিশু ছোঁয়াচে রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি রয়েছে। এর মধ্যে ৩১ জন ছেলে ও ৬ মেয়ে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, ‘হাসপাতালে হাম রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা বাড়ছেই। আমাদের চিকিৎসক ও নার্স সংকটের কারণে প্রচুর হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকবল নিয়োগ দিয়ে চিকিৎসা অব্যাহত রাখা হয়েছে। হাসপাতালের পুরাতন বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলায় আলাদা ওয়ার্ড করা হয়েছে, যাতে এই রোগ অন্যদের মধ্যে ছড়াতে না পারে।’
হাম রোগের প্রধান লক্ষণগুলো সম্পর্কে চিকিৎসকরা বলছেন,হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় রোগীর হাঁচি-কাশি, কথা বলা বা সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে এই ভাইরাস দ্রুত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। হামের জটিলতা থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখে ও মাথায় প্রদাহসহ বিভিন্ন রোগে শিশুরা আক্রান্ত হয় ও মৃত্যুঝুঁকি তৈরি হয়।
চিকিৎসা নিতে আসা এক শিশুর মা শরিফা বেগম বলেন, ‘প্রথমে ভেবেছিলাম সাধারণ জ্বর। কিন্তু শরীরে লাল দানা উঠতে শুরু করলে ভয় পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে আসি। এখানে আসার পর দেখছি অনেক শিশু এই রোগে ভুগছে। রোগীর চাপে সেবা পেতে অনেক সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।’
একই ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা অপর এক শিশুর বাবা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বাচ্চার বয়স মাত্র আট মাস। জানতাম না এত ছোট শিশুদেরও এই রোগ হতে পারে। আশপাশে আরও অনেকের হচ্ছে শুনে খুব আতঙ্কে আছি।’
জেলা হাসপাতালের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ মাহফুজ রায়হান বলেন, ‘হাম রোগটি পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। কিন্তু অবহেলা করলে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। ৯ ও ১৫ মাসে ২টি ডোজ হাম-রুবেলার টিকা দিতে হবে। যেসব শিশুর এই বয়সে এখনও টিকা দেওয়া হয়নি, তাদের দ্রুত টিকা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন কিছু বুঝে উঠার আগেই এখন পর্যন্ত চারজন মৃত্যু হয়েছে। একে তিনি টিকাদানে অনিহাকে দায়ি করে দ্রুত টিকা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, ৯ মাসের কম বয়সি শিশুদের টিকা দেওয়ার সুযোগ নেই। সুতরাং এই সময়ে শিশুদের বাসায় রাখতে হবে। ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে। রোগটিতে আক্রান্ত হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
হাসপাতালে হাম রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা বাড়ছেই জানিয়ে অন্যদের মধ্যে ছড়াতে না পারে এজন্য উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে এমনটাই ভলছেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ মশিউর রহমান।
জেলার সার্বিক অবস্থা নিয়ে সিভিল সার্জন ডা. একেএম শাহাব উদ্দিন বলেন, ‘হাম রোগ প্রতিরোধের জন্য প্রতি ৫ বছর পরপর একটি ক্যাম্পেইন করা হয়। সবশেষ এই ক্যাম্পেন হয়েছিল ২০১৯ সালে। নিয়ম অনুযায়ী ২০২৪ সালে ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন কারণে তা হয়নি। তবে আশা করা হচ্ছে, চলতি বছরেরই এপ্রিল অথবা মে মাসেই এই ক্যাম্পেইন করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই ভিজিট করছেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে হাম রোগীদের শনাক্ত করে ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে আসছেন। এই রোগটি প্রতিরোধযোগ্য, কাজেই আতঙ্কিত না হয়ে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।’