নিজস্ব প্রতিবেদক : দেশের ৫৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে বিশৃঙ্খলা, আর্থিক ব্যয় ও বছরের পর বছর সেশনজটের কারণে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা একটি সমন্বিত ভর্তি আবেদন ও সমন্বিত পরীক্ষা চালুর দাবি জানিয়েছেন।
তাদের অভিযোগ—প্রতি বছর শত শত পরীক্ষা, একাধিক ইউনিট, বিভিন্ন দিনে একই বিষয়ের পুনরাবৃত্ত পরীক্ষা, উচ্চ আবেদন ফি এবং দীর্ঘ সময় ধরে চলা ভর্তি প্রক্রিয়া শিক্ষার্থীদের ওপর চরম মানসিক, আর্থিক ও শারীরিক চাপ তৈরি করছে।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবি—অনেক বিশ্ববিদ্যালয় একই দিনে একই বিষয়ের দুইবার পরীক্ষা নিচ্ছে, আবার কাছাকাছি দিনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় একই বিষয়ের পরীক্ষা নিয়ে ইচ্ছাকৃত প্রতিযোগিতা তৈরি করছে।
তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন মানে সাধারণ মানুষের অধিকার খর্ব করা নয়।
একাধিক আবেদন ও ফি শিক্ষার্থীদের জন্য বড় একটি বাধা।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে একই বিভাগের শিক্ষার্থীকেও ২–৬টি ইউনিটে আবেদন করতে হয়, ফলে আবেদন ফি যুক্ত হয় কয়েক হাজার টাকা। প্রান্তিক শিক্ষার্থীরা এ কারণে বহু প্রতিষ্ঠানের ভর্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে সক্ষম হন না।
বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী, দূর-দূরান্তের শিক্ষার্থী এবং নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
মেডিকেল ভর্তি মডেলকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরলেন অভিভাবকরা।তাদের বক্তব্য—মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে বহু বছর ধরে সফলভাবে একটি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় দেশব্যাপী ভর্তি কার্যক্রম চলছে। একই মডেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গ্রহণ করলে বিশৃঙ্খলা কমে যাবে, সাশ্রয় হবে সময় ও অর্থ।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘনঘন ও ওভারল্যাপিং পরীক্ষার তারিখ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ঘোষিত ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচির উপর অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
অনেক দিনই দু'টি বা তারও বেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিষয়ের পরীক্ষা রাখা হয়েছে, ফলে একই শিক্ষার্থী সেসব পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না।
উদাহরণ হিসেবে তারা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮ ও ১৯ ডিসেম্বরের দুটি ইউনিটে একই বিষয়ের পুনরাবৃত্ত পরীক্ষা উল্লেখ করেছেন।
চারুকলা ও IBA–র আলাদা পরীক্ষাকেও অযৌক্তিক বলে দাবি করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা অনুষদের জন্য আলাদা আলাদা পরীক্ষা এবং ঢাকা, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের IBA–র পৃথক ভর্তি পরীক্ষাকে অপ্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেন তারা।
অভিভাবক–শিক্ষার্থীদের প্রস্তাবিত দাবি:
১. ৫৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মাত্র সমন্বিত ভর্তি আবেদন।
২. সারাদেশে একই দিনে একটি সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা (MCQ + লিখিত, ২০০ নম্বর)।
৩. জিপিএসহ মোট ৩০০ নম্বরের ভিত্তিতে জাতীয় মেধাতালিকা প্রকাশ।
৪. CAFMS এর মাধ্যমে একবারই আবেদন-ফি/ভর্তি ফি/মাইগ্রেশন ফি।
৫. পরীক্ষার ৩–৫ মাসের মধ্যে ক্লাস শুরু করে সেশনজটমুক্ত শিক্ষাবর্ষ।
৬. বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিং অনুযায়ী সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষার মূল দায়িত্ব বণ্টন।
৭. আবেদন ফি ও মাইগ্রেশন ফি–র স্বচ্ছ বণ্টন নীতিমালা
৮. ভর্তি প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তি-নির্ভর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রিত মডেল।
অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন রেখে বলেন, “এক বছর পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীর দায় কে নেবে?” “৬–৭ মাসব্যাপী ভর্তি পরীক্ষা কেন?” “একই দিনে একই বিষয়ের দুইবার পরীক্ষা কেন?” “কেন প্রান্তিক শিক্ষার্থীরা কেবল টাকার অভাবে সুযোগ হারাবে?” “স্বায়ত্তশাসনের নাম নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বেচ্ছাচারিতা কেন বন্ধ হচ্ছে না?”
প্রস্তাবিত রোডম্যাপ: সমন্বিত সফটওয়্যার ও দুই ধাপে চূড়ান্ত তালিকা।
অভিভাবকরা জানান, GST গুচ্ছ পদ্ধতির সফটওয়্যারকে সম্প্রসারণ করলেই সমন্বিত ভর্তি চালু করা সম্ভব।
প্রথম ১৫ দিনে আবেদনকারীরা নিশ্চয়ন দেবে, পরবর্তী ১০ দিনে মাইগ্রেশনের মাধ্যমে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। এক মাসের মাথায় ক্লাস শুরু করা সম্ভব।
চলমান ভর্তি প্রক্রিয়া স্থগিত করার কিছু দাবি করেন তারা। তাদের দাবি গুলো হলো; চলমান ভর্তি পরীক্ষা সাময়িক স্থগিত করে একীভূত ভর্তি পরীক্ষার ঘোষণা দেওয়া হোক এবং সকল বিশ্ববিদ্যালয় জনস্বার্থে একটি সমন্বিত নীতিতে সম্মত হোক।