মো আব্দুল শহীদ, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : মোহনপুরে মাদকবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার সাধারণ পরিবারের লোকজন এখন মাদক কারবারি কর্তৃক ফাঁসানোর আতঙ্কে আছেন। সম্প্রতি মাদকবিরোধী কার্যক্রমে তারা নালিশকারী ও স্বাক্ষী হওয়ায় প্রভাবশালী মাদক কারবারিরা তাদেরকে ফাঁসানোর হুমকি দিচ্ছে।
এমনকি আইন শৃঙ্খলা বাহিনির কতিপয় অসৎ সদস্যদের ম্যানেজ করেও নীরিহ পরিবারকে হুমকি ধমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় অসৎ সদস্য দিয়ে নিরীহ মানুষদের বাড়িঘরে তল্লাশিসহ তাদেরকে নানা অভিযোগে থানায়ও তলব করা হচ্ছে এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে। এ নিয়ে মাদকবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত লোকজন ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
জানা গেছে, গত ২৩ মার্চ মোহনপুর মাদকপ্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে মাদক প্রতিরোধে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় গ্রামের সাধারণ মানুষ একাট্টা হয়ে মাদক কারবারিদের প্রতিরোধের শপথ নেন। তারা সর্বসম্মতিক্রমে মাদক কারবারিদের সভায় তলব করে নানা আলামত ও স্বাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করে মাদক কারবারিদের তালিকা প্রস্তুত করেন। এই তালিকা ধরে গ্রামের যুবসমাজকে আভ্যন্তরীণ তদন্তে নিয়োগ করে তালিকা যাছাই বাছাই করে প্রকৃত মাদক কারবারিদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়।
পরবর্তীতে ২৮ মার্চ আবারও গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে চূড়ান্ত তালিকা ধরে সভায় চিহ্নিত মাদক কারবারিদের তলব করে ব্যবসা ছেড়ে ভালো হওয়ার আহ্বান জানান। ওইদিন চিহ্নিত মাদক কারবারি ইয়াবার ভাইরাল ডিলার খ্যাত রেজাউল, কাসেম, সালমান, রোমেন, শাহীন, সহিবুরসহ মাদক কারবারিরা মাদক ব্যবসার কথা স্বীকার করে ভবিষ্যতে আর মাদক কারবার করবেনা মর্মে প্রকাশ্যে ক্ষমা চায় এবং গ্রামবাসীর কাছে লিখিত মুচলেকা দেয়। ইয়াবা ডিলার রেজাউলের মাদককারবারের স্বীকারোক্তি ও ক্ষমাপ্রার্থনার ভিডিও এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।
ওইদিন গ্রামবাসী তাদেরকে সংশোধনের স্বার্থে সাময়িক ক্ষমা করে দেন এবং সদর থানা পুলিশকেও বিষয়টি অবগত করেন।
জানা গেছে এর আগের শালিসে গ্রামের নীরিহ পরিবারের সাধারণ মানুষ ওই মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন এবং সভায় নানা প্রমাণ উপস্থাপন করেন।
এ ঘটনার কিছুদিন পরই মাদক কারবারি রেজাউল আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সে সুনামগঞ্জ শহরের একটি রাজনৈতিক দলের বিতর্কিত কয়েকজন নেতা, সদর থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশের বিতর্কিত কয়েকজন সদস্যকে ম্যানেজ করে সাধারণ পরিবারের কিছু মানুষকে হয়রানি ও হুমকি ধমকি দিচ্ছে। গত ২৫ এপ্রিল মোহনপুর গ্রামের প্রতিবাদকারী আলেছা বেগমের ঘরে ডিবি পাঠিয়ে মাদক রয়েছে মর্মে তল্লাশি করে ডিবি। গতকাল পার্শবর্তী এলাকা থেকে তালিকাভূক্ত এক মাদক কারবারিকে আটকের পর তার সঙ্গে বিনা দোষে আলেছা বেগমের কিশোর ছেলেকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। আলেছা ও আফিজ মিয়া মাদক কারবারি রেজাউল তাদের ফাসাতে পারে এমন অভিযোগ সদর থানায় দিয়েছিলের।
এছাড়া এর আগে গ্রামের প্রতিবাদকারী বিশিষ্ট ব্যবসায়ী আব্দুর রহমানকে ফাঁসানোর হুমকি দেয় রেজাউল। আব্দুর রহমানকে সদর থানা পুলিশের এক কর্মকর্তা দিয়ে ফোনও দেওয়ায় মাদক কারবারি রেজাউল। এসব বিষয় গ্রামবাসীকে শুক্রবার মসজিদের শালিসে এবং পরদিন শনিবার শালিসে গ্রামবাসীকে অবগত করেন হয়রানির শিকার আব্দুর রহমান। এভাবে গ্রামের আখলাকুর রহমানসহ একাধিক ব্যক্তি মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় তাদেরকে মাদক দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে মাদক কারবারিরা। প্রতিবাদকারীরা এখন মাদক কারবারীদের ফাঁসানোর আতঙ্কে আছেন। জানা গেছে গত ৯ মে মাদকসহ সুনামগঞ্জ শহর থেকে মোহনপুর গ্রামের রেজাউল আলমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তাকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ফলে জামিন নিয়ে বেড়িয়ে এসে এখন নিরপরাধ প্রতিবাদকারীদের ফাঁসানোর কাজ করছে।
ভুক্তভোগী আব্দুর রহমান বলেন, মাদক কারবারিরা আমিসহ প্রতিবাদকারীদের নানাভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। আমি গ্রামবাসীর কাছে বিষয়টি অবগত করেছি।
গ্রামের আফিজ মিয়া বলেন, মাদক কারবারিদের প্রতিবাদ করায় আমি ও আলেছা বেগমসহ কিছু মানুষকে মাদক ব্যবসায়ীরা ফাঁসানোর চেষ্টা করছে। প্রতিবাদ করে আমরা এখন আতঙ্কে আছি। আমরা সদর থানা পুলিশকেও বিষয়টি অবগত করেছি।
মোহনপুর গ্রামের শালিসকারী ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম বলেন, আব্দুর রহমানসহ কিছু মানুষ আমাদের কাছে নালিশ করেছেন তাদেরকে মাদক কারবারিরা ফাঁসাতে পারে। তাদের আতঙ্কের বিষয়ে আমরা অবগত আছি। এ বিষয়ে শিগ্রই বসে আমরা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়ে মাদক কারবারিদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে কাজ শুরু করবো।
মোহনপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মঈনুল হক বলেন, মোহনপুরে মাদক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা নিয়মিত তদারকিসহ প্রশাসনকে মাদক প্রতিরোধে সহযোগিতা করবে। তবে অতীতে যারা আমাদের ভুল বুজিয়ে সার্টিফিকেট আদায় করেছিল তাদের মাদক ব্যবসার স্বীকারোক্তির পর সেটা বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি যাদেরকে প্রতিবাদের কারণে হয়রানি করা হবে তাদের পাশে আমরা থাকবো। সম্মিলিতভাবে আমরা মাদক কারবারিদের প্রতিরোধ করবো।
সুনামগঞ্জ সদর থানার ওসি শেখ রতন বলেন, মোহনপুর গ্রামবাসী কিছুদিন আগে মাদকপ্রতিরোধে যে কাজ করেছেন তা প্রশংসনীয়। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকায় নীরিহ কেউ হয়রানির শিকার হলে আমরা ব্যবস্থা নেব। আমাদের কোন সদস্যকে ম্যানেজ করে যদি কাউকে হুমকি ধমকি দেয় প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ওসি ডিবি মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আমাদের কোন সদস্য যদি মাদক কারবারীদের হয়ে প্রতিবাদকারীদের হুমকি ধমকি দেয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।