‘মৃধা মোঃ আল আমিন’
একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণে ভাষার ভূমিকা অনস্বীকার্য। ভাষা কেবল ভাবপ্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি ইতিহাসের ধারক, সংস্কৃতির বাহক এবং রাজনৈতিক চেতনার প্রেরণা। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের সেই ঐতিহাসিক সত্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যখন মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বীর ভাষাসৈনিকেরা। তাদের আত্মত্যাগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয় UNESCO; ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রশ্নটি আজ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
রাষ্ট্রভাষা ও রাষ্ট্রচেতনা একে অপরের পরিপূরক। বাংলাদেশ বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্র, যার জন্মভিত্তি ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় রচিত। সুতরাং প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, আইন প্রণয়ন, শিক্ষা, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে বাংলার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করা মানে স্বাধীনতার চেতনাকে কার্যকর করা। যদি রাষ্ট্রের ভাষা জনগণের ভাষা না হয়, তবে শাসনব্যবস্থা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়, নাগরিক অংশগ্রহণ সীমিত হয় এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি তৈরি হয়।
বিচারব্যবস্থায় বাংলার প্রয়োগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষ যদি আদালতের রায়, আইন কিংবা প্রশাসনিক প্রজ্ঞাপন বুঝতেই না পারেন, তবে ন্যায়বিচারের প্রকৃত অর্থ ক্ষুণ্ণ হয়। রাষ্ট্রের নথিপত্র ও আইনি ভাষা বাংলায় রচিত ও প্রয়োগ হলে বিচারপ্রার্থীর ভাষায় বিচার নিশ্চিত হয়, যা গণতান্ত্রিক ন্যায়পরায়ণতার মূল ভিত্তি।
শিক্ষাক্ষেত্রে মাতৃভাষার গুরুত্ব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। প্রাথমিক শিক্ষায় মাতৃভাষার ব্যবহার শিশুর চিন্তাশক্তি ও বোধগম্যতার বিকাশে সহায়ক। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় বাংলার ব্যবহার সম্প্রসারণ করলে জ্ঞানচর্চা দেশীয় বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত হয়। অবশ্যই বৈশ্বিক যোগাযোগের জন্য ইংরেজিসহ অন্যান্য ভাষার গুরুত্ব রয়েছে; তবে নিজের ভাষায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও মানবিক বিদ্যার সমৃদ্ধ ভাণ্ডার গড়ে তুলতে না পারলে টেকসই জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণ সম্ভব নয়।
ডিজিটাল যুগে ভাষা অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়েছে। ই-গভর্ন্যান্স, অনলাইন সেবা, কৃষি ও স্বাস্থ্য তথ্যব্যবস্থায় বাংলার কার্যকর প্রয়োগ সেবার পরিধি বাড়াতে পারে। প্রযুক্তিতে বাংলা-সমর্থিত সফটওয়্যার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল কনটেন্টের উন্নয়ন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্ভাবনকে ত্বরান্বিত করতে পারে। ভাষা তখন শুধু সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক নয়, বরং অর্থনৈতিক অগ্রগতির হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
তবে বাস্তবায়নের পথে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে—প্রযুক্তিগত পরিভাষার সীমাবদ্ধতা, দক্ষ অনুবাদকের অভাব এবং ইংরেজিনির্ভর প্রশাসনিক অভ্যাস। এসব কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন সুসংগঠিত ভাষানীতি, মানসম্মত পরিভাষা প্রণয়ন, সরকারি দপ্তরে বাংলার বাধ্যতামূলক ব্যবহার এবং উচ্চশিক্ষায় বাংলা গবেষণার প্রণোদনা। একই সঙ্গে ভাষাগত বহুত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে বাংলা হবে সংহতির সেতুবন্ধন।
অমর একুশে আমাদের শিখিয়েছে—ভাষা মানে মর্যাদা, ভাষা মানে স্বাধীনতার ভিত্তি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক, রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করে আমরা ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে জীবন্ত রাখব। বাংলা হবে প্রশাসনের ভাষা, ন্যায়বিচারের ভাষা, জ্ঞানচর্চার ভাষা এবং আগামী প্রজন্মের আত্মপরিচয়ের দৃঢ় ভিত্তি।