চিকিৎসাবিহীন আর কত প্রাণ ঝরলে শেষ হবে নির্মাণকাজ
- আপডেট সময় : ০৩:২১:৪৯ অপরাহ্ণ, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৬০ বার পড়া হয়েছে
রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি : পটুয়াখালী জেলার রাঙ্গাবালী বাংলাদেশের একমাত্র উপজেলা, যেখানে নেই কোনো হাসপাতাল। স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত দ্বীপ উপজেলার দুই লক্ষাধিক মানুষ। একাধিক পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ, মানববন্ধন, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হলেও মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর কাড়তে পারেনি বিষয়টি। সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—বিনা চিকিৎসায় আর কত প্রাণ ঝরলে নজরে আসবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের?
রাঙ্গাবালী উপজেলাটি তিনদিকে নদী ও একদিকে সাগর দ্বারা বেষ্টিত। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা মূলত নৌপথ নির্ভর এবং দেশের অন্যান্য অংশের সঙ্গে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। রাঙ্গাবালীর চারপাশ জলরাশি দ্বারা বেষ্টিত, যেখানে নদী ও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গম ঘটেছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার এই সীমাবদ্ধতার কারণে এখানকার মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়াও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত দুই লক্ষাধিক মানুষের জন্য নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল। ৫০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ শুরু হলেও এখন পর্যন্ত এর প্রায় ৫৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরপর নির্মাণকাজ শুরু হলেও ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে তা বন্ধ হয়ে যায়।
উন্নত চিকিৎসার জন্য শহরে যেতে হলে পাড়ি দিতে হয় ভয়াল আগুনমুখা নদী। এর উত্তাল ঢেউ ও তুফান উপেক্ষা করে নদী পাড়ি দেওয়া অনেকের কাছেই দুঃসাধ্য। তবুও জীবন বাজি রেখে অসুস্থ রোগী ও গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসার জন্য শহরে নিয়ে যেতে হয়। মাঝনদীতে অসুস্থ রোগীর মৃত্যু,গর্ভবতী নারীদের গর্ভপাতসহ অসংখ্য ঘটনার সাক্ষী উপজেলাবাসী।
এ ছাড়া আবহাওয়া খারাপ থাকলে বন্ধ থাকে সব ধরনের নৌযান চলাচল। ফলে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও রোগীদের শহরে নেওয়া সম্ভব হয় না। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স না থাকায় ওঝা, কবিরাজ ও পল্লিচিকিৎসকরাই অনেকের শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
উপজেলা প্রশাসন (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজের প্রায় ৫৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ সম্পন্ন করতে নতুন করে বরাদ্দ পাওয়া গেলে নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করে তা শেষ করা হবে।
উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে চারটিতে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, একটিতে উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ১২টি ওয়ার্ডে কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে জ্বর, সর্দি, কাশিসহ বিভিন্ন সাধারণ রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলেও এখানে নেই কোনো এমবিবিএস চিকিৎসক।
দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্যসেবার এই সংকট চলতে থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে রাঙ্গাবালী উপজেলাবাসীর মধ্যে। তাদের প্রশ্ন—চিকিৎসাবিহীন আর কত প্রাণ ঝরলে শেষ হবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নির্মাণকাজ?
উপজেলার বাসিন্দা তানভীর হাওলাদার কষ্ট ও আক্ষেপ নিয়ে জানান, বাবার মৃত্যুর কিছুদিন আগে তাঁর শারীরিক অবস্থার ব্যাপক অবনতি ঘটে। কিন্তু রাঙ্গাবালীতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় এবং দূরত্ব ও যাতায়াতের বাস্তবতা বিবেচনায় তাঁকে যথাসময়ে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তানভীর হাওলাদার বলেন, “আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না, সময়মতো চিকিৎসা পেলে আমার বাবা বেঁচে থাকতেন কি না। তবে একজন সন্তান হিসেবে আমার মনে সবসময় একটি প্রশ্ন থেকে যাবে—আমাদের এলাকায় যদি একটি ভালো হাসপাতাল থাকত, তাহলে হয়তো সংকটময় মুহূর্তে বাবাকে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হতো। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা পেলে হয়তো তাঁকে আরও কিছুদিন আমাদের মাঝে রাখা সম্ভব হতো।”
রাঙ্গাবালীতে দ্রুত একটি পূর্ণাঙ্গ উপজেলা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
পল্লী চিকিৎসক ইমরান মাহমুদ বলেন, রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া ছাড়া এখানে কিছুই করার নাই। অনেক সময় আমরা রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য শহরে যাইতে বললে অর্থনৈতিক সমস্যা এবং দূরত্বের কারণে অনেকেই যেতে পারে না। ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু হয়েছে এমন ঘটনা এখানে প্রায়ই ঘটে। কয়েকদিন আগেও ভুল চিকিৎসায় একজন রোগীর পা কেটে ফেলতে হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুল হাসান বলেন, রাঙ্গাবালী উপজেলা স্বাস্থ্যে কমপ্লেক্সের কাজ বরাদ্দ না পাওয়ার কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। হাসপাতালের বাকি কাজ শেষ করার জন্য এখন নতুন করে টেন্ডার হয়েছে। কাজটি দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য চেষ্টা করছি।
পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, রাঙ্গাবালী উপজেলার নির্মাণাধীন ৫০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য টেন্ডার হয়েছে খুব শীঘ্রই কাজ শুরু হবে। এছাড়াও বর্তমান সরকার উদ্যোগ নিয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যেকটি উপজেলায় ১৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে।
এরই ধারাবাহিকতায় রাঙ্গাবালী হাসপাতাল সবার আগে অগ্রাধিকার পাবে। কারণ, এখানে কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নেই। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও অবগত রয়েছে



















