‘তৌফিকুর রহমান তাহের’

সিলেট এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ৩য় তলার ১১নং ওয়ার্ডের এক কোণে, একটি লাল টবে একটি পাম গাছ বেশ অনেক দিন ধরে টিকে আছে। ফাইলে ঠিক যেমনটি দেখা যাচ্ছে, এটি শুধুই একটি অবহেলিত বা সাধারণ গাছ নয়; এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর জীবনবোধ, এটি যেন একটি চেনা পরিবারের রূপক।

গাছটি এক সময় ঘন, সতেজ পাতায় ভরা ছিল। তার কচি ডালপালা ছিল যেন বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েদের হাসির মতো—উচ্ছল, সবুজ এবং প্রাণবন্ত। কিন্তু সময় স্থির থাকে না। আবহাওয়া পাল্টায়, ঋতু বদলায়। মানুষের জীবনও তাই। হাসপাতালের এই ওয়ার্ডের কোণে থাকা টবের গাছটির একটি বড়, ঘন ডাল আজ শুকিয়ে গেছে, ঠিক যেমন এর পাতারা ঝরে গেছে।

সেই মৃত পাতাগুলো মনে করিয়ে দেয় চলে যাওয়া প্রিয়জনদের স্মৃতি। হয়তো সেই ডালটি ছিল এক বড় ভাইয়ের মতো, যে অনেক দূর চলে গেছে, বা এক বোনের মতো, যে নিজের সংসার সাজাতে পরবাসে পাড়ি দিয়েছে। অথবা হতে পারে সেই ডালটি ছিল কোনো অকাল-হারানো আপনজনের, যাকে মা-বাবা বুক ফেটে স্মরণ করেন। সেই মৃত পাতার দিকে তাকালে মা-বাবার চোখ ভিজে ওঠে, বুকের ভেতরটা হু হু করে। তাদের এক সময়ের পরিপূর্ণ ঘর এখন যেন নিঃঝুম হয়ে গেছে, যেখানে শুধু একে একে সব হারিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু, একটু ভালো করে লক্ষ্য করলে ছবির গাছটির বাকি অংশে এখনো কিছু সবুজ পাতা উজ্জ্বল হয়ে থাকতে দেখা যায়। এই সবুজ পাতাগুলো হলো সেই ভাইবোনেরা, যারা এখনো পাশে আছে। হয়তো তারা দূরে থাকে, কিন্তু ফোনের ওপাশে তাদের কণ্ঠস্বর, বা ছুটির দিনে হঠাৎ তাদের আগমন এই বৃদ্ধ মা-বাবার মৃতপ্রায় জীবনে বসন্ত নিয়ে আসে। এই সবুজ পাতাগুলো হলো আশা, শক্তি এবং ভালোবাসা, যা শিকড়কে ভিজিয়ে রাখে। এই বেঁচে থাকা পাতাগুলোর জন্যই মা-বাবা এখনো সকালের সূর্যকে স্বাগত জানান।

জীবনের এই গল্পটি কোনো দুঃখের গল্প নয়; এটি টিকে থাকার গল্প। মৃত পাতাগুলো আমাদের শেখায় যে, যা চলে গেছে তাকে শ্রদ্ধার সাথে মনে রাখা। আর সবুজ পাতাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যা এখনো আমাদের আছে তার মূল্য দেওয়া। হাসপাতালের এক কোণে পড়ে থাকা এই টবের গাছটি হলো সেই পরিবারের প্রতীক, যা ঝড়ের সাথে যুদ্ধ করেছে, কিছু হারিয়েছে, কিন্তু তার শিকড় এখনো মাটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে আছে। কারণ জীবনের শেষ আছে, কিন্তু ভালোবাসার কোনো শেষ নেই।