কুমিল্লা প্রতিনিধি ::মাত্র দেড় ঘণ্টার টানা ভারী বৃষ্টিতেই পানিতে ভেসে গেছে কুমিল্লা নগরীর বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।

সোমবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া প্রবল বর্ষণে নগরীর বিভিন্ন স্থানে সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা। হাঁটু থেকে কোথাও কোথাও কোমরসমান পানি জমে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ। ব্যাহত হয় যান চলাচল, দেখা দেয় তীব্র যানবাহন সংকট। অফিসফেরত মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয় পথচারীদের।

সরেজমিনে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় চকবাজার, রাজগঞ্জ, মহিলা কলেজ সড়ক, সদর হাসপাতাল সড়ক, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড এলাকা, পানি ভবন, স্টেডিয়াম এলাকা এবং সিটি কর্পোরেশন কার্যালয় সংলগ্ন সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পানি জমে যায়। অনেক এলাকায় সড়কের অস্তিত্বই যেন পানির নিচে হারিয়ে যায়। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও আবার কোমরসমান পানি জমে মানুষের চলাচল কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

নগরীর সিটি কর্পোরেশন সড়কে হাঁটুর ওপর পর্যন্ত পানি উঠে যায়। এ সময় অনেককে প্যান্ট হাঁটুর অনেক উপরে তুলে পানি মাড়িয়ে গন্তব্যের দিকে যেতে দেখা যায়। কেউ জুতা হাতে নিয়ে খালি পায়ে হাঁটছেন, আবার কেউ ভেজা কাপড় নিয়েই অফিস কিংবা বাসার উদ্দেশে ছুটছেন। হঠাৎ সৃষ্ট এ জলাবদ্ধতায় নগরজীবন যেন থমকে যায়।

সদর হাসপাতাল সড়কে পানি জমে থাকায় রোগী ও তাদের স্বজনদের দুর্ভোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। অনেক রোগীকে পানির মধ্য দিয়ে হেঁটে হাসপাতালে প্রবেশ করতে দেখা যায়। অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য যানবাহনের চলাচলও বাধাগ্রস্ত হয়। হাসপাতাল এলাকায় জমে থাকা পানির কারণে জরুরি সেবা গ্রহণেও কিছুটা ভোগান্তির সৃষ্টি হয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

শুধু জলাবদ্ধতাই নয়, এদিন নগরীতে দেখা দেয় তীব্র যানবাহন সংকটও। বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইক চালকদের অনেকেই যানবাহন নিয়ে রাস্তায় বের হননি। চালকদের আশঙ্কা, জলাবদ্ধ সড়কে চলাচল করলে মোটর ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশে পানি ঢুকে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ফলে বৃষ্টির সময় এবং পরে নগরীর বিভিন্ন সড়কে অটোরিকশার সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো কম।

ফলে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। অনেকেই প্রয়োজনীয় যানবাহন না পেয়ে বাধ্য হয়ে হেঁটে গন্তব্যে রওনা দেন। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের দুর্ভোগ ছিল সবচেয়ে বেশি। নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা লক্ষ্য করা যায়।

নগরীর চকবাজার এলাকায় পানি মাড়িয়ে বাসায় ফিরছিলেন পথচারী মো. সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, প্রতিবার বৃষ্টি হলেই একই অবস্থা হয়। মাত্র এক ঘণ্টা বৃষ্টিতেই পুরো রাস্তা পানির নিচে চলে গেছে। অফিস শেষে বাসায় ফিরতে খুব কষ্ট হচ্ছে। যানবাহনও পাওয়া যাচ্ছে না।

রাজগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা নাসরিন আক্তার বলেন, জলাবদ্ধতা এখন কুমিল্লা শহরের নিত্যদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তায় পানি জমে যায়। নারী ও শিশুদের নিয়ে চলাচল করা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে।

সিটি কর্পোরেশন সড়কে আটকে পড়া কলেজ শিক্ষার্থী রাকিব হাসান বলেন, অটো পাওয়া যাচ্ছে না। কয়েকজন চালকের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা বলছেন মোটরে পানি ঢুকে গেলে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। তাই অনেকেই গাড়ি বের করেননি। বাধ্য হয়ে হেঁটেই বাসার দিকে যাচ্ছি।

একই সড়কে পানি ভেঙে চলতে থাকা ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, দোকান বন্ধ করে বের হয়েছি, কিন্তু রাস্তায় এত পানি যে হাঁটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক দোকানে পানি ঢুকে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের ক্ষতি হবে।

বৃষ্টির কারণে নগরীর বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। নিচু এলাকায় অবস্থিত অনেক দোকানে পানি ঢুকে পড়ে বলে অভিযোগ করেন ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, হঠাৎ করে পানি জমে যাওয়ায় অনেকেই পণ্য সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাননি। এতে ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কুমিল্লা নগরীতে দীর্ঘদিন ধরেই ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করেছে।

তাদের মতে, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। ফলে নগরবাসীকে বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

জেলা আবহাওয়া কর্মকর্তা সৈয়দ আরিফুর রহমান বলেন, আজ বিকাল ৫ টা থেকে সাড়ে ৬ টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৯১ দশমিক ৪ মিলিমিটার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, জলাবদ্ধতার পানি যাতে দ্রুত নেমে যায় ইতিমধ্যেই আমরা কাজ করেছি। শহরের ভিতরের বিভিন্ন খাল আমরা পরিষ্কার করেছি। আজকে যে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে সেটা কেন হচ্ছে আমরা এর জন্য খালগুলোতে তদারকি করছি, কোথায় পানি আটকে আছে সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। আশা করছি, খুব দ্রুত ভাল একটা ফলাফল দিতে পারবো নগরবাসীকে। আমাদের চেষ্টা অব্যহত আছে।

নগরবাসীর দাবি, প্রতি বর্ষা মৌসুমে একই দুর্ভোগ আর দেখতে চান না তারা। দ্রুত ও স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নিয়মিত নালা-নর্দমা পরিষ্কার করার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় সামান্য সময়ের বৃষ্টিতেই কুমিল্লা নগরী বারবার পানিতে ডুবে জনদুর্ভোগের নগরীতে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা তাদের।