কুমিল্লা প্রতিনিধি : কুমিল্লা নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অনাগত সন্তানসহ এক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্বজনদের অভিযোগ, ভুল চিকিৎসা ও ইনজেকশন প্রয়োগের কারণেই প্রসূতি মোসা. রীমা আক্তার (২৮) মারা গেছেন। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছে, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যথাযথ চিকিৎসাই দেয়া হয়েছিল।

সোমবার ১৫ জুন বিকেলে নগরীর বাদুরতলা এলাকায় অবস্থিত মেডিকমপ্লেক্স সৌহার্দ্য হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। নিহত রীমা আক্তার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার জয়দেবপুর গ্রামের আবদুল খালেকের মেয়ে। প্রায় ১০ বছর আগে তার বিয়ে হয় কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার শুভপুর এলাকার মো. বিল্লাল হোসেনের সঙ্গে। তাদের সিফাত (৭) ও সিয়াদ (২) নামে দুই সন্তান রয়েছে।

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রসূতিজনিত শারীরিক সমস্যার কারণে সোমবার বিকেল ৩টার দিকে রীমাকে মেডিকমপ্লেক্স সৌহার্দ্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গাইনি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শান্তা রাণী পালের পরামর্শ নেওয়া হলে তিনি রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে একটি অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন প্রেসক্রিপশনে লিখে দেন এবং তা দ্রুত পুশ ইন করার নির্দেশ দেন।

পরিবারের সদস্যদের দাবি, হাসপাতালের এক মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ইনজেকশনটি প্রয়োগ করার প্রায় দুই মিনিটের মধ্যেই রীমার শরীরে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তার শরীর ঝাঁকুনি দিতে শুরু করে এবং তিনি বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হলে হাসপাতালের নার্স তাকে পাশের একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। সেখানে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক উল্লেখ করে দ্রুত কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। তবে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথেই রীমার মৃত্যু হয় বলে স্বজনরা জানান।

মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ স্বজনরা রীমার মরদেহ নিয়ে মেডিকমপ্লেক্স সৌহার্দ্য হাসপাতালের সামনে অবস্থান নেন। এ সময় তারা হাসপাতালের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে সেখানে উত্তেজনা ও হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। স্বজনদের সঙ্গে হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের বাকবিতণ্ডা এবং হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিল্লাল হোসেন বলেন, আমার স্ত্রী বিকালেও নিজের পায়ে হেঁটে হাসপাতালের চার তলায় উঠেছিল। আমরা শুধু ডাক্তারের পরামর্শ নিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু একটি ইনজেকশন দেওয়ার পরই সব শেষ হয়ে গেল। আমার স্ত্রী ও অনাগত সন্তান দুজনকেই হারালাম। এখন আমার দুই সন্তান কাকে মা বলে ডাকবে? আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।

অন্যদিকে হাসপাতালের পরিচালক পর্ষদের সদস্য ও ম্যানেজার কাজী জসিম উদ্দিন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, রোগীকে কোনো ভুল চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। চিকিৎসক যে ওষুধ ও চিকিৎসা নির্দেশনা দিয়েছেন, আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছি। ইনজেকশন প্রয়োগের পর রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তার আগে থেকেই শারীরিক ব্যথা ও জটিলতা ছিল।

ঘটনার পর হাসপাতালের সামনে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কুমিল্লা জেলা পুলিশের সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুল মালিক এবং কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার পুলিশ সদস্যদের নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সাইফুল মালিক বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ পাঠানো হয়, যাতে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয়। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে আমরাও ঘটনাস্থলে যাই এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। এ বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ করা হলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এ ঘটনায় প্রসূতি ও তার অনাগত সন্তানের মৃত্যুকে ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিবার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে।