মাজেদুল ইসলাম আকাশ : নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ় সংকল্প মানুষকে লক্ষ্যে পৌঁছাতে কোন কিছুতেই আটকে রাখতে পারেনা। খ্যাতিমান চিন্তাবিদদের এমন ধারনাকে আবারও সত্য বলে প্রমাণ করেছেন পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার ৪৭ তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত আহসান হাবীব রয়েল। বিসিএসের চুড়ান্ত ফল ঘোষণার পর থেকেই এলাকায় প্রশংসায় ভাসছেন মেধাবী এই শিক্ষার্থী। তাঁর এই ধারাবাহিক সাফল্য অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও লক্ষ্যনিষ্ঠ প্রস্তুতির একটি অনন্য উদাহরণ হিসেবে মনে করছেন এলাকার সচেতনমহল।
গত রবিবার ২৮ জুন বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ৪৭তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করে। প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, বিভিন্ন ক্যাডারে ১ হাজার ৩২০ জন এবং নন-ক্যাডার পদে ২০১ জনসহ মোট ১ হাজার ৫২১ জনকে সাময়িকভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। সেই তালিকায় প্রশাসন ক্যাডারে স্থান করে নিয়েছেন পঞ্চগড়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আহসান হাবীব রয়েল।
মো. আহসান হাবীব রয়েল পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার পৌরসভা ১ নং ওয়ার্ড কলেজ পাড়া গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত কলেজ কর্মচারী বেলায়েত হোসেন বেলালের পুত্র। তিনভাই বোনের মধ্যে সে দ্বিতীয়। আহসান হাবীব শিক্ষাজীবনে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার বোদা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি, একই উপজেলার পাথরাজ মহাবিদ্যালয় থেকে ২০১২ সালে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হোন। পরবর্তীতে তিনি রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একাডেমিক অধ্যবসায়ের পাশাপাশি বিসিএসের দীর্ঘ প্রস্তুতির মাধ্যমে তিনি ধারাবাহিক এই সাফল্য অর্জন করেন।
আহসান হাবিব রয়েল জানান, তিনি এ পর্যন্ত মোট ৩ বার বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে ৪৪ তম বিসিএস পরীক্ষায় নন ক্যাডারে সুপারিশ প্রাপ্ত হয়ে বর্তমানে লালমনিরহাট সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে গণিত বিভাগে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। পরেরবার ৪৫ তম বিসিএসে নন ক্যাডারে সমাজসেবা অফিসার হিসেবে সুপারিশ প্রাপ্ত হয়েছেন।
আহসান হাবীব আরও জানান, আমার এই পর্যন্ত আসার পেছনে তিনজন মানুষের অবদান অপরিসীম। তারা হলেন আমার বাবা, বড়ভাই ও বন্ধু মইন খান। আমার বাবা সামান্য বেতনে পাথরাজ কলেজের কর্মচারী ছিলেন। তিনি চরম দারিদ্র্যতার সাথে যুদ্ধ করলেও সব সময় ন্যায় নীতি আদর্শ অবলম্বন করে পথ চলার সাহস যোগাতেন। নিজে খেয়ে না খেয়ে আমাদের তিনভাই বোনকে পড়াশোনার খরচ যোগাতে সচেষ্ট থাকতেন। এক পর্যায়ে আমার বড় ভাই ফিরোজ হাবিব নিজের পড়াশোনা ও সরকারি চাকুরির চেষ্টা বন্ধ করে বেসরকারি চাকুরী করে আমার পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। অন্যদিকে বন্ধু মইন খান (বর্তমানে ভূমি সহকারী কমিশনার) সার্বক্ষণিক পরামর্শ ও সাহস যুগিয়েছেন। তাদের কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ।
বড়ভাই ফিরোজ হাবিব জানান, আহসান হাবীব ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত ধার্মিক ছিল। গ্রামের পরিবেশ তেমন ভালো না হলেও সে কখনও মন্দ কাজের সাথে নিজেকে জড়াতোনা। ছোটবেলা থেকেই সে নিয়মানুবর্তিতার সহিত পড়াশোনা করতো। স্কুল জীবনে প্রতিটি শ্রেণীতে সে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করতো, এর ব্যত্যয় কখনো হয়নি। আর্তজ সামাজিক ভাবে আমাদের পরিবার ভীষণ অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে গেছে। আমাদের ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন মুলত বাবার। তিনি সামান্য চাকুরী করে যা সঞ্চয় করেছিলেন তা দিয়ে দুই বিঘা আবাদি জমি কিনেছিলেন। কিন্তু আমাদের জন্য শেষ সম্বল টুকু বিক্রয় করে পড়াশোনার খরচ যুগিয়েছেন বাবা।
আহসান হাবীব রয়েলের বাবা, বেলায়েত হোসেন জানান, কলেজে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে চাকুরী করার সময় অনেক গরীব মেধাবী ছাত্রদের দেখতাম পড়াশোনা করে একসময় সম্মানিত হয়েছে। আমিও স্বপ্ন দেখতাম নিজের সন্তানদের বড় মানুষ হিসেবে দেখার। একটা সময় ভীষণ কষ্টে পরিবার চালাতে হয়েছে। আজ আহসান হাবীবের সাফল্য আমার পরিবারের সকল কষ্ট দূর করে খুশিতে পরিনত করেছে।