তৌফিকুর রহমান তাহের, বিশেষ প্রতিনিধি সুনামগঞ্জ : প্রকৃতি আর মানুষের তৈরি সংকটের মাঝে পিষ্ট সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লা উপজেলার হাওরপাড়ের কৃষকেরা। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টির হাত থেকে বাঁচিয়ে যে সামান্য পরিমাণ ধান কৃষকেরা অনেক কষ্টে ঘরে তুলেছিলেন, তা নিয়েই এখন শুরু হয়েছে এক নতুন দুর্যোগ। আর এই দুর্যোগের নাম-ধানের দালাল ও ব্যাপারী সিন্ডিকেট।

প্রকৃতির মার খেয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকা কৃষকেরা এখন বাজারে ধান বিক্রি করতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। পানির দরে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা, অথচ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম আকাশছোঁয়া।

সাধারণত হাওরাঞ্চলে ধান এক নম্বর বা দুই নম্বর গ্রেড হিসেবে বেচাকেনা হয়। কিন্তু এই বছর সিন্ডিকেটের কারবারিরা ধানের মান নিয়ে নতুন এক চাল চালছেন। নিজগাঁও গ্রামের কৃষক ওহেদনুর মিয়া, মমিন মিয়া এবং মনির হুসেন ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন:

আমরা কী আর করবো, ঘরের এই ধান নিয়ে এখন কোথায় যাবো? সারা জীবন শুনলাম ধান এক নাম্বার আর দুই নাম্বার হয়। এই বছর কারবারিরা সিন্ডিকেট করে ধান চার নাম্বার পর্যন্ত বানিয়েছে! অতিবৃষ্টির আগে যে সামান্য ধান কাটা হয়েছিল, ব্যাপারীরা শুধু সেটাই নিতে চায়। পরের ধানগুলো নিতেই চায় না।

বর্তমানে দিরাই-শাল্লার প্রতিটি ঘরে এখন একটাই হাহাকার—ধান কিছু ঘরে থেকেও না থাকার মতো। কৃষকেরা জানান, বর্তমানে বাজারে গরুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত বনের (খড়ের) মণ যেখানে ১,০০০ টাকা, সেখানে অনেক কষ্ট করে ফলানো ১ নম্বর ধানের দামও ব্যাপারীরা ১,০০০ টাকা বলতে চায় না। উল্টো ভিজে যাওয়া বা একটু কালো হয়ে যাওয়া ধানের দাম হাঁকা হচ্ছে মাত্র ৫০০ থেকে <৬০০ টাকা মণ!

অনেকে ধানের ব্যাপারীকে বারবার ডেকেও বাড়ি পর্যন্ত আনতে পারছেন না। বাজারে ধান নিয়ে গেলে সিন্ডিকেটের সদস্যরা এক জোট হয়ে দাম কমিয়ে দিচ্ছে। কৃষকদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে। একদিকে ঘরে তীব্র অভাব-অনটন, অন্যদিকে দৈনিক বাজার করার মতো নগদ টাকা নেই। বাধ্য হয়ে কম দামেই ধান ছেড়ে দিতে হচ্ছে। কৃষকদের কথায়, কম দামে বিক্রি করলে কর, না করলে নাই—এমন একটা ভাব দেখাচ্ছে ব্যাপারীরা।

ধানের দাম নেই, বাধ্য হয়ে নামমাত্র দামে বিক্রি হচ্ছে শেষ সম্বল ‘গরু’ ধান বিক্রি করে সংসারের খরচ চালানো বা দেনা পরিশোধ করা যখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে, তখন হাওরপাড়ের কৃষকদের ওপর নেমে এসেছে আরেক নতুন বিপদ। ঘরে ধান থাকা সত্ত্বেও নগদ টাকার অভাবে তারা এখন তাদের শেষ সম্বল গৃহপালিত গরু পানির দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন।

ভুক্তভোগী কৃষকেরা জানান, এমনিতে ধানের বাজারে সিন্ডিকেটের কারণে লোকসান, তার ওপর গরুর খাদ্য বা খড়ের দাম ধানের চেয়েও বেশি। ফলে একদিকে সংসার চালানোর জরুরি তাগিদ, অন্যদিকে গরুর খাদ্য কেনার সামর্থ্য না থাকায় সস্তায় গরু ছেড়ে দিতে হচ্ছে। পাইকাররা কৃষকদের এই নিরুপায় অবস্থার সুযোগ নিয়ে গরুর দামও অর্ধেক হাঁকাচ্ছে।

এমনিতেই ফসলের মাইর, তার ওপর এখন টিকে থাকার জন্য ঘরের গরুগুলোও পানির দামে বিক্রি করে শেষ করে দিতে হচ্ছে। আমরা হাওরপাড়ের মানুষ আর যাবো কোথায়? একমাত্র আল্লাহ জানে কী হবে আমাদের অবস্থা!

হাওরের কৃষকদের এই চরম দুর্দশার জন্য মূলত দায়ী স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগী ও ধানের আড়তদারদের সিন্ডিকেট। সরকারিভাবে ধান কেনার সঠিক তদারকি না থাকা এবং কৃষকদের সরাসরি বাজারে প্রবেশাধিকার সীমিত হওয়ার সুযোগ নিচ্ছে এই চক্রটি।

বিপদের ওপর বিপদ জেঁকে বসা এই অসহায় কৃষকেরা এখন কার কাছে যাবেন? কার কাছে চাইবেন বিচার? অতিবৃষ্টিতে ফসল হারিয়ে, আর অবশিষ্ট ফসল ও শেষ সম্বল সিন্ডিকেটের পেটে দিয়ে দিরাই-শাল্লার হাওরপাড়ের মানুষ এখন দিশেহারা। এই নির্মম সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং কৃষকদের ধান ও গবাদিপশুর ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে প্রশাসনের জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সুনামগঞ্জের আপামর ভুক্তভোগী কৃষক সমাজ।