নিজস্ব প্রতিবেদক, পঞ্চগড় : পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায় মাদরাসার সাময়িক বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ যোগদান করতে গিয়ে উপজেলা বিএনপির সভাপতির উপস্থিতিতে নেতাকর্মীদের বেধরক লাঠিপেটার স্বীকার হয়েছেন।
রবিবার ২৯ মার্চ দুপুরে আটোয়ারি উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের লক্ষীপুর ইসলামিয়া আলিম মাদরাসার সামনে পঞ্চগড়-আটোয়ারী আঞ্চলিক সড়কের পাশে এই ঘটনাটি ঘটে। এতে অধ্যক্ষ, তার স্ত্রী, শ্যালিকা সহ অন্তত ৬জন বিএনপি নেতাকর্মীদের মারধরের শিকার হন। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশের হস্তক্ষেপে আব্দুল মতিনকে বাসায় পৌছে দেয়া হয়। আহতরা বিভিন্নভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন বলে জানা গেছে।
জানা যায় , আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের লক্ষীপুর ইসলামিয়া আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে গত বছরের ২৭শে মে সাময়িক বরখাস্ত করে পরিচালনা কমিটি। পরে আটোয়ারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনার তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করেন। তবে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহারের নিয়ম থাকলেও মাদরাসা পরিচালনা কমিটি গত এক বছরেও তা প্রত্যাহার করেননি। এরই মাঝে মাদরাসার এডহক কমিটি উপাধ্যক্ষ ও একজন জৈষ্ঠ্য প্রভাষককে বাদ দিয়ে ইসলামের ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক আব্দুল হাকিম সরকারকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দ্বায়িত্ব দেন। যদিও এর আগে মাদরাসা বোর্ডের আপিল এন্ড আরবিটেশন সভায় আব্দুল হাকিম সরকারকে চূড়ান্ত বরখাস্ত করা হয়। গত ৮ মার্চ মাদরাসা বোর্ডের রেজিস্ট্রার প্রফেসর ছালেহ আহমেদের এক চিঠিতে বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন সরকারকে স্বপদে বহাল করা হয়। একই সাথে প্রস্তাবিত মাদরাসার পরিচালনা কমিটি বাতিল করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বেতন বিলে স্বাক্ষরের অনুমোদন দেয়া হয়। পরে জেলা আদালতের জিপির মতামত নিয়ে রবিবার সকালে মাদরাসায় যোগদান করতে যান অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন সরকার। এসময় উপজেলা বিএনপির সভাপতি এজেডএম বজলুর রহমানের উপস্থিতিতে তার ছেলে নাফিউর রহমান সহ স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা বাঁধা দেন। পরে দুপরের দিকে অধ্যক্ষ মাদরাসা সংলগ্ন একটি দোকানে অবস্থান নিলে বজলুর রহমানের ছেলে নাফিউর সহ বিএনপি নেতাকর্মীরা তাকে বেধরক মারধর করে। এরপরে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। পরে তিনি এলাকা ত্যাগ করার সময় আবারো লাঠিসোটা নিয়ে মাদরাসা অধ্যক্ষকে বেধড়ক লাঠিপেটা করেন। এসময় তিনি প্রাণে বাঁচতে স্থানীয় একটি বাসাতে প্রবেশ করেন। এসময় বাড়ির মালিক ও তার স্ত্রী, অধ্যক্ষের স্ত্রী, শ্যালিকা সহ ৬ জন আহত হন।
সাময়িক বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ আব্দুল মতিন সরকার বলেন, আমি মাদরাসা বোর্ডের নির্দেশনা পেয়ে রবিবার সকালে যোগদান করতে যাই। এসময় আমাকে বাঁধা দেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি এজেডএম বজলুর রহমানের উপস্থিতিতে তার ছেলে নাফিউর রহমান সহ স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা। তারা আমার কাছে ২০ লাখ টাকা দাবি করেছে যোগদানের জন্য। পরে আমি চলে আসি। দুপুরে আমাকে ধাওয়া করে বেধরক লাঠিপেটা করে। আমি সস্ত্রীক ৬ জন আহত হয়েছি। প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছি। আমি বৈধ হওয়ার পরেও যোগদান করতে দেয়নি। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।
বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল হাকিম সরকার বলেন, আমি বর্তমান কমিটির নির্দেশনায় আইন মেনে দ্বায়িত্বে আছি। অধ্যক্ষ নানা অনিয়মে জড়িত হয়ে বরখাস্ত হন। তিনি আমাকে বরখাস্ত করে রেখেছিলেন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার স্বীকার হয়ে। আমার চেয়ে যারা সিনিয়র তারা দায়িত্ব নিতে চাননি। পরে আমি দায়িত্ব পাই।
উপজেলা বিএনপির সভাপতি এজেডএম বজলুর রহমান বলেন, এই মাদরাসা আমার নানার প্রতিষ্ঠা করা। আমরা কখনো কোন প্রভাব খাটাইনি। মাদরাসার অধ্যক্ষ বিভিন্ন অনিয়মের সাথে জড়িত। তিনি বরখাস্ত ছিলেন। এলাকাবাসী তাকে চেনে, জানে। তাকে নিয়ে শিক্ষকেরা মিটিং করেছে। কেউ তাকে মেনে নিচ্ছেনা। তিনি বলেন, তার কাছে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়েছে এতে উত্তেজিত জনতা ক্ষেপে যায়। পরে আমি তাদের শান্ত করি। আমরা অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করবোনা আমরা চাই ন্যায় নীতি।
আটোয়ারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিয়ার রহমান বলেন, আমাদের পুলিশ অধ্যক্ষকে উদ্ধার করে নিরাপদে বাসায় পৌঁছে দিয়েছে। তবে এ ঘটনায় কেউ কোন অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ দিলে আমরা ব্যবস্থা নেবো।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিপামনি দেবী বলেন, আমি একটি চিঠি পেয়েছি যেটাতে সভাপতির স্থলে অধ্যক্ষকে বহাল বেতনের সিটে আমাকে স্বাক্ষর করার কথা বলা হয়েছে। পরে বিষয়টি নিয়ে জেলা আদালতের জিপির মতামত নেয়া হয়। তিনি আজকে যোগদান করতে গিয়ে যে ঘটনাটি ঘটেছে তা স্থানীয় বিষয়। তবে কোন অভিযোগ হলে আমি ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করবো।