মুহাম্মদ বাকের হোসাইন : আমাদের দেশে আজকাল ‘দ্বিতীয় ঘর’ বা সেকেন্ড হোম কথাটি বেশ পরিচিত। একসময় এই কথা শোনা যেমন যেতো না, মানুষ নামটির সাথেও পরিচিত ছিলো না। জমিদারি প্রথা থাকা অবস্থায় জমিদারদের কেউ কেউ বা নবাবি প্রথা থাকা অবস্থায় কোনো কোনো নবাব আমোদ-ফুর্তি করার জন্য ঘরের মধ্যে বা ঘরের বাইরে বালাখানা করতেন বলে ইতিহাসের অন্তরালে জানা যায়। সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশে হারাম আয়-রোজগারে যারা অঢেল পুঁজি-পাট্টার মালিক হয়েছেন তারাও সিঙ্গাপুর, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে সেকেন্ড হোম বা বেগম পাড়া নামে বিলাস-ব্যাসন ও নানাবিধ আনন্দে দিন কাটানোর জন্য দ্বিতীয় ঘর গড়ে তোলেন। এ সব ঘরে তাদের প্রথম স্ত্রী থাকেন না স্ত্রীও দ্বিতীয় হয়ে যান তা সচরাচর জানা যায় না, তবে নতুনত্বের সাধ নেয়াই যদি দ্বিতীয় ঘরের মতলব হয়ে থাকে তাহলে স্ত্রীরও সংস্করণ পাল্টে যাওয়ারই কথা। অন্যদিকে দেশেও অনেক বিলাসী বিত্তবান রাজধানী বা শহরের কোলাহল থেকে দূরে নিরিবিলি ও প্রকৃতির নিসর্গে বাগানবাড়ি নামে দ্বিতীয় ঘর বানিয়ে বিশেষ করে রাতের আঁধারে গিয়ে অবসর কাটান, আমোদ-আহ্লাদে সময় কাটান। কথা আছে এসব জায়গায় তাদের ‘নিয়মিত বউ’ প্রবেশাধিকার পান না। এখানে অননুমোদিত বা সংখ্যাতিরিক্ত গোপন নর্ম সহচরীরা সম্রাজ্ঞী হিসেবে স্থান পায়। আমাদের এক রসিক বন্ধু টাকাওয়ালাদের এই দ্বিতীয় ঘর এবং একে কেন্দ্র করে যাবতীয় কর্মকাণ্ডকে এককথায় বলে ধনিক শ্রেণীর যোগ ব্যায়াম।
অন্যদিকে পেশাজীবী সাংবাদিকদের মজমা জমে যে স্থানটিতে সেই জাতীয় প্রেসক্লাবকেও বলা হয় সাংবাদিকদের দ্বিতীয় ঘর। কবি সাংবাদিকরা এ নিয়ে কবিতা লিখেন। চালু আছে বিষয় সঙ্গীতও(থিম সং)। এক্ষেত্রে কিছু আবেগ-অনুভূতিও কাজ করে বলে হয়।
তাহলে এটা আবার কোন দ্বিতীয় ঘর, কোন দ্বিতীয় ফুর্তি? বিত্তশালী, জমিদার, লুঠেরা পুঁজিপতি বা নবাবদের যে দুই নম্বর ঘর সেই অর্থে জাতীয় প্রেসক্লাব দ্বিতীয় ঘর নয়। এটা মেহনতি সাংবাদিকদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না ও চাওয়া-পাওয়া ভাগাভাগির জায়গা। আমাদের মহৎপ্রাণ অগ্রজ সাংবাদিকরা তাঁদের জ্ঞান, দূর ও দিব্য দৃষ্টিতে আজ থেকে একাত্তর বছর আগে ১৯৫৪ সালে আজ ২০ অক্টোবর অনুভব করেছিলেন গণতন্ত্র চর্চার অন্যতম বাহন ও উপাদান সাংবাদিকতা পেশা ও সংবাদ মাধ্যমে কাজ করে পেশাজীবীরা একদিকে যেমন হাঁপিয়ে উঠবেন অন্যদিকে নানামত, নানাপথের চর্চা করার কারণে তাদের মধ্যে মতভেদ, মতানৈক্য দলপ্রবণতা দেখা দিতে পারে।এতে সাংবাদিক সমাজে বিভক্তি তৈরি হওয়ার আগাম আশংকা থেকে তারা সাংবাদিকদের জন্য একটি সর্বজনীন মিলনকেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন যার ফল হচ্ছে জাতীয় প্রেসক্লাব।
অগ্রজদের ভাবনায় ছিলো জীবন-জগত, সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং সমাজে বিবর্তনের ধারায় মানুষের মধ্যে বিভাজনের আঁচড় সাংবাদিকদের মধ্যেও লাগবে। পেশা ও পেশাদারদের সম্ভাব্য সেই ক্ষতি থেকে বাঁচাতে পারে একমাত্র সহনশীলতা ও সহনশীল পরিবেশ। সহনশীল পরিবেশ তৈরির সেই কেন্দ্র হচ্ছে জাতীয় প্রেসক্লাব। সে জন্য জাতীয় প্রেসক্লাব সদস্যদের মধ্যে রেওয়াজগতভাবে তিনিই বরেণ্য যিনি বেশি সহনশীল ও উদার। সমাজ-সংস্কৃতির প্রভাবে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে অন্যকথায় অনেককিছু হারিয়েছি আমরা কিন্তু তারপরও এখনো প্রেসক্লাবের চা-কফির টেবিলে বসে দলমত নির্বিশেষে যে প্রাণপ্রাচুর্যের বিনিময় হয়, যে স্বতঃস্ফূর্ততায় সাংবাদিকরা কায়ক্লেশ মুক্ত হয়, সজীবতা ফিরে পায় তা সমাজের অপরাপর অংশে দুর্লভই বলতে হবে। তাহলে আমাদের পূর্বসুরিরা যে চিন্তা-চেতনায় এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন সেই দূরদর্শনে তাঁরা সার্থক।
জাতীয় প্রেসক্লাবের আজকের ৭১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তাঁদের প্রতি অনন্ত শ্রদ্ধা। কিন্তু এই শ্রদ্ধা জানানো সফল হবে যদি আমরা তাঁদের সহনশীলতার চেতনাকে ধরে রাখতে পারি। আমরা যেনো ভুলে না যাই সহনশীলতাই গণতন্ত্রের যেমন তেমনি তা জাতীয় প্রেসক্লাবেরও প্রাণভোমরা। এ জন্য প্রেসক্লাবকে বলা হয় ‘স্বৈরতন্ত্রের সমুদ্রে গণতন্ত্রের দ্বীপ’।(অ্যান আইল্যান্ড অব ডেমোক্রেসি ইন দ্য ওশেন অব অটোক্রেসি) স্বৈরাচার এরশাদের পতনে জাতীয় প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়নের ঐতিহাসিক ভূমিকার কারণে জাতীয় প্রেসক্লাব এলাকাকে গণতন্ত্র চত্বর নাম দেয়ার জন্য জনগণের পক্ষ থেকে যে দাবি উঠেছিলো তা-কি আমরা ভুলে গেছি, ভুলা কি উচিত?
জাতীয় প্রেসক্লাবের ভৌত অবকাঠামো একসময় আজকের মতো শানশওকতের ছিলো না। সে দিক থেকে আমরা এগিয়েছি, সন্দেহ নেই, ইনশাআল্লাহ সামনে আরো আগাবো কিন্তু যে গণতান্ত্রিক সহনশীলতার দার্শনিক ভিতের উপর ক্লাব দাঁড়িয়ে আছে এবং যা ছাড়া ক্লাবের বিকাশ সম্ভব না সেই ভিত কি মজবুত হয়েছে? তাই আজকের আনন্দঘন মুহূর্তে আমরা যেনো একটু আত্মসমালোচনা করে নিজেদের শোধরে নিতে ভুলে না যাই। ভুলে গেলে তা আমাদের জন্য অনুতাপের কারণ হবে। আল্লামা ইকবাল তাঁর এক কবিতায় তাই আফসোস করে লিখেছেন : রেহ গিয়া রসমে আজাঁ রূহে বিলালী না রাহি, ফলসফা রেহ গিয়া, তালকিনে গাজ্জালী না রাহি অর্থ: আজানের রেওয়াজ তো আছে কিন্তু হজরত বিলালের সেই প্রাণপ্রাচুর্য তো নেই, দর্শন শাস্ত্র তো আছে কিন্তু ইমাম গাজ্জালীর আদর্শ কই?
তাই আজকের এই দিনে সাংবাদিকদের দ্বিতীয় ঘর জাতীয় প্রেসক্লাব গণতন্ত্র, সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক ভালোবাসায় ভরপুর হোক, সাংবাদিকরা গণতন্ত্র চর্চার উপমা হোক, বিয়োগ নয়, যোগই প্রেরণা এই হোক আমাদের শপথ।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনন্দক্ষণে জাতীয় প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দ, ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ভাই-বোন, সহকর্মী বন্ধু সদস্যদের জানাই একরাশ শুভেচ্ছা আর কর্মচারী ভাইবোন-যারা সারাবছর দিনরাত পরিশ্রম করে আমাদের সেবা দেন তাদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা। জাতীয় প্রেসক্লাব জিন্দাবাদ।
মুহাম্মদ বাকের হোসাইন
সাবেক সাধারণ সম্পাদক
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন-ডিইউজে