শিরোনাম :
পঞ্চগড়ে রাশেদ প্রধানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা, দলীয় কার্যালয় ভাংচুর অসুস্থ বন্ধুর মন ভালো রাখতে ন্যাড়া হলেন ১০ যুবক রূপসায় ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী লিটন তালুকদারের গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরণ কৃষকদের স্বাবলম্বী করতে কাজ করছে সরকার : কৃষিমন্ত্রী টাঙ্গাইলে এসএসসি ‘৯৬ ব্যাচের ৩০ বছর পূর্তি ও মিলনমেলা অনুষ্ঠিত রাজিবপুরে জরিমানা দাবিতে ক্ষুব্ধ জনতা, অবরুদ্ধ প্রশাসন  আমতলীতে দ্বিতীয় দিনে চলে গণঅনশন সাঁড়াশি অভিযানে জিম্মি ২ জেলে উদ্ধার, অস্ত্রসহ দয়াল বাহিনীর সদস্য আটক সুনামগঞ্জের ডিসি বদলির আদেশে জেলাজুড়ে বইছে আনন্দের বন্যা মুখস্থের অবসান, মেধার উন্মোচন: দক্ষতাভিত্তিক বিসিএসের অনিবার্যতা
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৭ অপরাহ্ন

মুখস্থের অবসান, মেধার উন্মোচন: দক্ষতাভিত্তিক বিসিএসের অনিবার্যতা

Reporter Name / ১৭ Time View
Update : শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬

মৃধা মোঃ আল আমিন : বাংলাদেশের প্রশাসনিক নিয়োগব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে এমন এক মূল্যায়ন কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল, যেখানে জ্ঞানকে প্রায়শই স্মৃতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। অর্থাৎ, যে যত বেশি তথ্য মুখস্থ করতে পারে, তাকে তত বেশি মেধাবী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর জ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে এই ধারণা শুধু সেকেলে নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ঝুঁকিপূর্ণও বটে। এই প্রেক্ষাপটে বিসিএস পরীক্ষায় মুখস্থভিত্তিক পদ্ধতির পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন চালুর সরকারি উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ।

প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, মুখস্থভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি মূলত একটি “তথ্য পুনরুৎপাদন” প্রক্রিয়া। এখানে প্রার্থীর বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা বা বাস্তব সমস্যার সমাধান দক্ষতা পরিমাপের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ফলত, এই পদ্ধতিতে যারা সফল হয়, তারা অনেক সময় পরীক্ষায় দক্ষ হলেও বাস্তব প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুর্বল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকারিতা তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, কারণ প্রশাসন পরিচালনার জন্য প্রয়োজন কেবল তথ্যজ্ঞান নয়, বরং সেই জ্ঞানকে প্রাসঙ্গিকভাবে প্রয়োগ করার সক্ষমতা।

এর বিপরীতে দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে প্রার্থীর জ্ঞানকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং তার দক্ষতা ও মনোভাবের সঙ্গে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ, একজন প্রার্থী কী জানে—তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সে কীভাবে চিন্তা করে, কীভাবে সমস্যা বিশ্লেষণ করে এবং কীভাবে বাস্তব পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রশাসনিক কাজের প্রকৃতির সঙ্গে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে প্রতিনিয়ত জটিল, বহুমাত্রিক ও অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো অনেক আগেই এই বাস্তবতা অনুধাবন করেছে। যুক্তরাজ্যের সিভিল সার্ভিসে দীর্ঘদিন ধরে “কম্পিটেন্সি ফ্রেমওয়ার্ক”-এর ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যেখানে প্রার্থীর আচরণগত দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং নেতৃত্বগুণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সিঙ্গাপুরে পাবলিক সার্ভিস কমিশন কেবল একাডেমিক ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না; বরং কেস স্টাডি, গ্রুপ ডিসকাশন এবং বাস্তবধর্মী পরিস্থিতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রার্থীর সামগ্রিক সক্ষমতা যাচাই করে। ফিনল্যান্ড বা কানাডার মতো দেশগুলোতেও প্রশাসনিক নিয়োগে সিমুলেশনভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু রয়েছে, যেখানে প্রার্থীদের বাস্তব পরিস্থিতির অনুরূপ পরিবেশে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এই অভিজ্ঞতাগুলো প্রমাণ করে, দক্ষতাভিত্তিক পদ্ধতি কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়; বরং কার্যকর, পরীক্ষিত এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য।

বাংলাদেশে এই পদ্ধতি চালু হলে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনটি ঘটবে, তা হলো মেধার প্রকৃত মূল্যায়ন নিশ্চিত হওয়া। মেধা কেবল তথ্য ধারণের ক্ষমতা নয়; বরং তা একটি সমন্বিত গুণ, যেখানে বিশ্লেষণ, বিচারবোধ, সৃজনশীলতা এবং নৈতিকতা একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। দক্ষতাভিত্তিক পরীক্ষায় এই বহুমাত্রিক মেধাকে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি কেস স্টাডির মাধ্যমে বোঝা সম্ভব হয়—একজন প্রার্থী কীভাবে একটি জটিল প্রশাসনিক সমস্যা বিশ্লেষণ করে, কী ধরনের সমাধান প্রস্তাব করে এবং সেই সমাধানের পেছনে তার যুক্তি কতটা সুসংগত। এই ধরনের মূল্যায়ন পদ্ধতি মুখস্থভিত্তিক পরীক্ষায় কল্পনাও করা যায় না।

দক্ষতাভিত্তিক পদ্ধতি চালু হলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী পরীক্ষামুখী প্রস্তুতির কারণে প্রকৃত জ্ঞানার্জনের পরিবর্তে মুখস্থ করার দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু যখন পরীক্ষার ধরন পরিবর্তিত হবে, তখন শিক্ষার্থীদেরও তাদের শেখার পদ্ধতি পরিবর্তন করতে হবে। তারা কেবল তথ্য সংগ্রহে নয়, বরং তা বোঝা, বিশ্লেষণ করা এবং প্রয়োগ করার দিকে মনোযোগ দেবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে একটি সৃজনশীল ও চিন্তাশীল প্রজন্ম গড়ে উঠবে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অবশ্যই, এই রূপান্তর সহজ হবে না।

দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত পরীক্ষক, স্বচ্ছ মূল্যায়ন কাঠামো এবং সুপরিকল্পিত সিলেবাস। তবে চ্যালেঞ্জ থাকলেই যে পরিবর্তন থেমে থাকবে—এমন ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়। বরং এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার মাধ্যমেই একটি আধুনিক, কার্যকর এবং ন্যায্য নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

বিসিএস পরীক্ষায় মুখস্থভিত্তিক পদ্ধতির পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন চালুর উদ্যোগ কেবল একটি প্রশাসনিক সংস্কার নয়; এটি একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও কাঠামোগত রূপান্তরের সূচনা। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে রাষ্ট্র এমন একটি প্রজন্মের প্রশাসক পেতে পারে, যারা কেবল তথ্যের ধারক নয়, বরং জ্ঞানকে প্রয়োগ করতে সক্ষম, সমস্যা সমাধানে দক্ষ এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারদর্শী। সুতরাং, এই উদ্যোগকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা শুধু যৌক্তিকই নয়, বরং সময়ের দাবি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

সম্পাদকীয়

সম্পাদক ও প্রকাশক