তৌফিকুর রহমান তাহের, সুনামগঞ্জ বিশেষ প্রতিনিধি : মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের চূড়ান্ত লগ্নে ১৯৭১ সালের আজকের এই দিনে (৭ ডিসেম্বর) সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই এবং শাল্লা উপজেলা পাক-হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের কবল থেকে সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়েছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও অসম সাহসিকতায় হাওর অঞ্চলের এই দুটি জনপদে উড়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, অসংখ্য শহীদ এবং পেরুয়া গণহত্যার মতো ভয়াবহ বর্বরতার স্মৃতি বহন করে দিরাই-শাল্লাবাসী অর্জন করেছিল কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।
মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর থেকেই হাওর অঞ্চলের মানুষ স্বাধীনতার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী জনতা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যাচার ও নির্মমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দিরাই ও শাল্লার বিভিন্ন স্থানে হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা ও সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। হাওর-বাঁওড়ের দুর্গম পথকে কাজে লাগিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা পাক-বাহিনীর ওপর তীব্র আঘাত হানেন।
এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথে দিরাই-শাল্লার মানুষজনকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ভয়াবহ বর্বরতার শিকার হতে হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো পেরুয়া গণহত্যা। পাক-হানাদার এবং তাদের দোসর রাজাকার-আলবদর বাহিনী দিরাই উপজেলার পেরুয়া গ্রামে (তৎকালীন পেরুয়া বাজারের কাছাকাছি) নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালায়। এই নির্মম গণহত্যায় অসংখ্য নিরীহ মানুষ শহিদ হয়েছিলেন, যা এই অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত।
ডিসেম্বরের শুরু থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযান জোরদার হয়। দিরাই উপজেলায় মিত্র বাহিনী ও স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বিত আক্রমণে হানাদার বাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং ৭ ডিসেম্বর প্রত্যুষে পাক-সেনারা দিরাই থেকে পালিয়ে গেলে উপজেলাটি সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হয়। একই দিনে দিবাগত রাতে শাল্লায়ও পাক-সেনারা অবস্থান ত্যাগ করলে বীর মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়োল্লাসে শাল্লার মাটিতে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। শত্রুমুক্ত হওয়ার আনন্দ যেমন ছিল, তেমনি ছিল স্বজন হারানোর গভীর বেদনা। বীর শহীদদের আত্মত্যাগই আজকের এই মুক্তির ভিত্তি।
প্রতি বছরই দিরাই ও শাল্লা উপজেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এবং বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচির আয়োজন করে এই দিনটিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। বিশেষ করে পেরুয়া গণহত্যায় শহিদ এবং জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানানো হয়।
তবে, এবছর শাল্লা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই মুক্ত দিবস উপলক্ষে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও জনসাধারণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, “বীর মুক্তিযোদ্ধা বলরাম দাস সহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদে বসছিলাম, উনাদের পরামর্শেই মুক্তিযোদ্ধা ভবনে পতাকা টানিয়ে আসছি।”
অন্যদিকে, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের যুগ্ম আহ্বায়ক বলরাম দাস শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা না জানানোর কারণ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা নিখিল দাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আজকে এই দিনটি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করার দিন। কিন্তু উপজেলা প্রশাসন থেকে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়নি, এতে আমি খুব মর্মাহত। আমি মুক্তিযোদ্ধা সংসদের আহ্বায়ক, প্রশাসন থেকে কোনো কিছু করা হলে আমাকে জানানোর কথা, কিন্তু আমরা তো কিছুই জানি না। আমরা প্রতিবছর এই মুক্ত দিবসে শহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও দোয়া করে আসছি। এবছর কেন এমন হলো তা জানিনা।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এ ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, “যে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সহকর্মী শহীদ ভাইদের সম্মান করতে পারে না, তারা এই দেশকে কিভাবে সম্মান করবে? তারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার যোগ্য না, এদের মুক্তিযুদ্ধের সকল প্রমাণাদি যাচাই-বাছাই করে দেখা হউক।”
দিরাই-শাল্লাবাসীর কাছে এই মুক্ত দিবস কেবল একটি তারিখ নয়, এটি সাহস, আত্মত্যাগ এবং চূড়ান্ত বিজয়ের এক সমুজ্জ্বল প্রতীক। এমন একটি ঐতিহাসিক দিনে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে উপজেলা প্রশাসনের এমন নীরবতা হতাশাজনক বলে মনে করছেন এলাকার সচেতন মহল।