সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৪৯ পূর্বাহ্ন

বোদায় টাকা ছাড়া মিলছে না ভিডাব্লিউবি কার্ড

Reporter Name / ১৩৫ Time View
Update : সোমবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

এম আই আকাশ, বোদা,পঞ্চগড় : পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ী ইউনিয়নে সরকারি ভিডাব্লিউবি (ভালনারেবল উইমেন বেনিফিট) কার্ডের চাল বণ্টনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তারা প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় নারীদের বাদ দিয়ে বিত্তশালী পরিবারের হাতে এসব কার্ড তুলে দিচ্ছেন। প্রতি কার্ডের বিনিময়ে নেয়া হচ্ছে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ।

সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অংশ হিসেবে হতদরিদ্র নারীদের জন্য দেওয়া হয় ভিডাব্লিউবি কার্ড। প্রতিটি কার্ডধারী নারী নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রকৃত অসহায় নারী এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অন্যদিকে যাদের সামর্থ্য আছে, এমনকি স্বচ্ছল পরিবারের সদস্যরাও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে লেনদেন করে সুবিধাভোগী হচ্ছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়নের কিছু জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তি মিলে একটি চক্র গড়ে তুলেছে। তারা গরীব নারীদের বাদ দিয়ে নিজেদের আত্মীয়-স্বজন, স্বচ্ছল পরিবার কিংবা আর্থিকভাবে সক্ষমদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে ভিডাব্লিউবি কার্ড করে দিচ্ছেন। ফলে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা বঞ্চিত হয়ে অসহায় অবস্থায় পড়েছেন।

অভিযোগকারীরা জানান, শুধু স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাই নয়—যারা এই তালিকা অনুমোদন দিয়েছেন তারাও দায় এড়াতে পারেন না। এর আগে একাধিকবার অভিযোগ জানানো হলেও তা সঠিকভাবে তদন্ত করা হয়নি। বরং প্রশ্ন উঠেছে, কীসের বিনিময়ে তালিকা অনুমোদন দেওয়া হলো।

এ তালিকা অনুমোদন করেছেন—তৌইবুর রহমান, সভাপতি, ইউনিয়ন ভিডাব্লিউবি কমিটি, আওলাদ হোসেন, সদস্য সচিব, ইউনিয়ন ভিডাব্লিউবি কমিটি, রবিউল ইসলাম, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বোদা ও এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, বোদা। স্থানীয়দের দাবি, তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা তদন্তসাপেক্ষে পরিষ্কার হওয়া জরুরি।

এক বয়স্ক প্রতিবন্ধী ভ্যানচালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমি সারাদিন প্যাডেল ভ্যান চালিয়ে শুলা বিক্রি করে যা আয় করি, তা দিয়ে সংসার চালাতেই কষ্ট হয়। তবুও আমার নামে কোনো কার্ড আসেনি। অথচ পাশের বাড়ির ধনী মানুষ টাকা দিয়ে কার্ড নিয়ে গেছে। এটা খুবই অবিচার।”

 

এক অসহায় গৃহবধূর অভিযোগ— “আমার স্বামী অসুস্থ, সংসারে পাঁচজন মানুষ। একজনের উপার্জনে সংসার চলে না। তারপরও আমাকে তালিকায় রাখা হয়নি। চেয়ারম্যানের লোকজন টাকা ছাড়া কার্ড দেয় না।”

এক হতাশ যুবক জানান, “আমি দিনমজুর, প্রতিদিন কাজ পাই না। সরকার গরীব মানুষের জন্য যে চাল দেয়, সেই চাল আমাদের মতো মানুষের হাতে পৌঁছায় না—কারণ মাঝপথেই কারসাজি হয়ে যায়।”

এক প্রবীণ নারী ক্ষোভে বলেন, “আমরা ভোট দিই, নেতা বানাই—কিন্তু আমাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে সেই নেতারাই। চালের কার্ড করতে নাকি সাত হাজার টাকা খরচ হয়। আমরা তো গরীব—আমরা সাত হাজার টাকা দিতে পারলে তো কার্ডের জন্য বলতাম না।”

এক স্থানীয় কৃষক ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, “আমরা কৃষক, সারাদিন খেটে খাই। কিন্তু এ প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছে বড়লোকেরা। টাকা ছাড়া কার্ড মেলে না—এটা জনগণের সাথে প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। আমাদের সামান্য আয়ে সংসার চলে না, কারণ গরীবের তো কেউ নেই।”

এক বিধবা নারী জানান, “আমি বিধবা হয়েও কোনো কার্ড পাইনি। অথচ যারা বড় ঘরে থাকে, তাদের নাম লিস্টে উঠে গেছে। শুনেছি ৬ হাজার টাকা দিলে কার্ড পাওয়া যায়। গরীব মানুষ টাকা কোথায় পাবে?”

আরেকজন ক্ষুব্ধ ভ্যানচালক জানান, “আমার একটি ভ্যান ছিলো। অসুস্থ হয়ে পড়লে সেটি বিক্রি করতে হয়। পরে কার্ডের জন্য আবেদন করেছিলাম, কিন্তু টাকা দিতে না পারায় কার্ড পাইনি। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্যই হচ্ছে গরীব মানুষকে সাহায্য করা। অথচ জনপ্রতিনিধিরা এটাকে ব্যবসায় পরিণত করেছে। আমরা ন্যায়বিচার চাই।”

চন্দনবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান তৌইবুর রহমান বলেন, “তালিকা প্রকাশের পর কিছু অভিযোগ পেয়েছি। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তারা বলেছেন, এগুলো নোট করে রাখতে এবং পরে সংশোধন করা হবে।”

এ বিষয়ে জানতে জেলা মহিলা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান সম্রাট-এর সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। অফিসে গিয়ে সাংবাদিকরা বক্তব্য চাইলে তিনি কথা বলতে অস্বীকার করেন এবং তথ্য অধিকারে আবেদন দিতে বলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তালিকা প্রকাশের পূর্বেই তাঁকে জানানো হয়েছিল; তবুও তিনি অনিয়মিত তালিকায় সাক্ষর করে অনুমোদন দেন।

ভিডাব্লিউবি কার্ডের মাধ্যমে গ্রামীণ অসহায় নারীরা সরকারি সহায়তায় কিছুটা হলেও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে এই প্রকল্প এখন প্রশ্নবিদ্ধ। স্থানীয়দের দাবি—সঠিক তদন্ত হলে অনিয়মের অসংখ্য প্রমাণ মিলবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

সম্পাদকীয়

সম্পাদক ও প্রকাশক