সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:২৬ পূর্বাহ্ন

কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন : যেখানে টাকা দিলে অনিয়মই হয়ে যায় নিয়ম

Reporter Name / ২৮৭ Time View
Update : শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

মোঃ ইয়াছিন মিয়া, কুমিল্লা প্রতিনিধি : সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৪ বছর হলেও গ্রাহক সেবার মান বাড়েনি। তবে বছর বছর বেড়েছি হোল্ডিং ট্যাক্স।

কুমিল্লা সিটিকরপোরেশন দেশের অন্যতম প্রাচীন কুমিল্লা সদর পৌরসভার সাথে পাশের সদর দক্ষিণ পৌরসভাকে একত্রিত করে ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।

৫৩.৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনে ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে এ সিটিকরপোরেশনের কার্যক্রম। প্রায় ৮ লাখ জনসংখ্যা অধ্যূষিত এই নগরীতে অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা, ভ্রমনসহ অন্যান্য সেবা নিতেও আসে প্রতিদিন আরো কমপক্ষে লক্ষাধিক মানুষ। এই যখন অবস্থা তখন সিটিকরপোরেশনের নাগরিক সেবা বন্দি নানামুখী সমস্যায়। যার সবগুলোও সিন্ডিকেটের কবলে। আপনি যে কোন কিছু করবেন, সেটা নিয়মের মাধ্যমে করতে হবে। আর না হয় চুক্তিতে আসেন টাকা দিবেন, সব অনিয়মই হয়ে যাবে তখন নিয়ম। আর এইভাবে দেশের প্রাচীন, পরিচ্ছন্ন সুন্দর কুমিল্লা নগরী বর্তমানে বসবাসের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

দায়িত্বশীল প্রতিটি স্থান থেকেও বলা হচ্ছে, নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কেবল উচু উচু ভবন নির্মানের নামে হয়েছে কোটি কোটি টাকার লুটপাট।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার আগে মূল জেলা শহরের আদর্শ সদর পৌরসভা এলাকাতেই ছিল জেলার প্রধান প্রধান অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ব্যাংক-বীমা-শপিং মল, বিলাসবহুল বিপনী বিতান ইত্যাদি। ফলে সিটিকরপোরেশন গঠনের পর জনস্রোত বাড়তে থাকে। এ সময় বাসা-বাড়ি, বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল-ক্লিনিক নানামুখী ভবন স্থপন শুরু হলেই নিয়ম নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে সিটি করপোরেশনের একটি অসাদূ চক্র সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। এঅবস্থায় ভবন নির্মান অধ্যাদেশের তোয়াক্কা না করে সম্পূর্ণ নিয়ম বহিভূতভাবে ভবন নির্মাতাদের সাথে অলিখিত চুক্তি করতে শুরু করে। ফলে যেখানে ৩.৬ বা ৯ তলা উচু ভবন নির্মানের অনুমতি আছে, সেখানে কোটি কোটি টাকায় সিন্ডিকেটচক্র অতিরিক্ত উচু উচু ভবন নির্মানের অনুমতি দেয়। আর এসময় জায়গার গুরুত্ব বিবেচনায় সার্ভেয়ার নামক একটি চক্রের বেড়াজালে অনিয়মকে নিয়মে রূপান্তরের নামে ভবন মালিকরা কাঙ্খিত অনুমোদন পেয়ে যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ছোট্ট এই নগরীর বর্তমান অবস্থা খুবই ভয়াভহ। জনসংখ্যার চাপে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নগরীর জীবন যাত্রা থমকে যাচ্ছে প্রতিদিন। সড়ক কিংবা যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না থাকলেও উচু উচু ভবন নির্মান, ডোবা, পুকুর বা জলাশয় ভরাটের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করা, ভবন নির্মানের আগেই বহুতল ভবনগুলোর কোন কোন অংশে আবাসিক বা বানিজ্যিক কার্যক্রম চালু, ভবন নির্মান অধ্যাদেশে মূল জায়গার চারপাশে একটা নির্দিষ্ট জায়গা খালি রাখা, ভবন নির্মান অধ্যাদেশ না মানা স্বত্ত্বেও ওই সব ভবনে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনায় “নো প্রোবলেম” সিটিকরপোরেশনে বসে সরকারী নিয়মনীতি না মেনে ইচ্ছে মতো ট্যাক্স কমানো, বাড়ানো, সিটিকরপোরেশনে চাকুরীতে থেকে ওই একই প্রতিষ্ঠানে মালামাল সাপ্লাই তথা ব্যবসা, স্ত্রী পরিজনদের দিয়ে কারো কারো ঠীকাদারী ব্যবসা, একই ব্যক্তি আর্থিক সুবিধার জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষেকে আর্থিক সুবিধা দিয়ে একই স্থানে বছরের পর বছর চাকুরী, একই ব্যক্তি একাধিক পদেদায়িত্ব পালন, প্রতিটি সার্ভেয়ার কে কিছু দিন পরপর বদলীর নিয়ম থাকলেও পালন না করা, সার্ভেয়ার ভারপ্রাপ্ত কাউন্সিলর এর দায়িত্ব পালন, নকশা পছন্দ মতো অনুমোদন, কোন কোন অসাদু কর্মচারী বছর শেষে বিদেশ ভ্রমন, একেকজনের একাধিক বহুতল বাড়ি, কাজ না করে সহকারীকে দিয়ে কাজ করনো, শুধু স্বাক্ষরের কাজ করা, চুক্তিতে আসলে বাড়ির ট্যাক্স কমিয়ে দেওয়া, সিন্ডিকেট করে মুল কাজ না করে আর্থিক সুবিধা যেসব কাজে থাকে সেটা করা, কোন কোন কর্মকর্তা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নিজের বাড়ির ট্যাক্স নাম মাত্র নির্ধারন, বিগত হাসিনা স্বৈরাচার সরকারের সময়ে সিটি মেয়র পদ বাগিয়ে নেওয়া তাহসিন বাহার সুচনা’র ঠিকাদারী সিন্ডিকেট যখন তীব্র বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পালিয়ে যায়, তখন তার সমর্থিত ওই ঠিকাদারী সিন্ডিকেট সদস্যরাও পালিয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে সিটি করপোরেশনের কেউ কেউ সেই সকল কাজগুলো বর্তমানে একটি সুবিধাবাদী পক্ষের সাথে আপোষরফার মাধ্যমে করিয়ে নিচ্ছে। আর এইসব অনিয়মের হর্ততাকর্তা ছিলেন, সাবেক সিটিকরপোরেশনের নির্বাহী বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ওএসডি সামসুল আলমের নেতৃেত্বে সিন্ডিকেট। সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরো জানান, সামসুল আলম তার সময় নিয়ম বহির্ভূতভাবে যেসব ভবনের অনুমোদন দিয়েছিলেন, বর্তমানে প্রতি মাসে এসে সেই সব খাত থেকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সংগ্রহ করা টাকার ভাগ নিয়ে যায়।

 

গত বছরের ৫ আগস্টের পর সিটি কর্পোরেশনের একাধিক ড্রেন ও রাস্তা নির্মাণেও অনিয়ম দেখা যায়। এ নিয়ে কেউ কিছু বললেই যেভাবেই হউক তাকে মেনেজ করতে উঠে পরে লেগে থাকেন ঐ চক্র।

 

এ নিয়ে কুমিল্লার সিনিয়র সাংবাদিক সেলিম রেজা মুন্সী বলেন, “কুমিল্লা মহনগর ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও আমরা নগরীর সেই কাঙ্খিত সেবা থেকে এখনো বঞ্চিত। এর অনেকগুলো কারনের মধ্যে অন্যতম একটি কারন হলো, সিটি কর্পোরেশনের লোকবল কম। আর এ সুযোগে অনেক কর্মকর্তা কর্মচারী আছেন যারা দীর্ঘদিন যাবত একই জায়গায় একাধিক পদে দায়িত্ব পালন করছেন। যার কারনে সব কিছুতেই একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। আর সেবার মান কমেছে। তবে আমি বিশ্বাস করি, সিটি কর্পোরেশনে নতুন প্রশাসক এসেছেন। ওনার হাত ধরে এ সিটি কর্পোরেশনের দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দূর্ণীতি দুর হয়ে যাবে। এবং গ্রাহক সেবার মান বাড়বে।”

 

এ বিষয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক শাহআলম বলেন, “আপনি নিশ্চয়ই অবগত আছেন আমি সবেমাত্র প্রশাসক হিসেবে যোগদান করেছি। আমি বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি, ভবন নির্মাণ থেকে শুরু করে অনেক কাজেই অনিয়ম হয়েছে। আমি সেগুলোকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। এগুলো চিহ্নিত হলে প্রতিটি অনিয়ম, দূর্নীতির বিরুদ্ধে আমি আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবো।

আর বর্তমানে সিটি কর্পোরেশনে একটা নতুন টিম তৈরি করেছি যারা শুধু নতুন তৈরি হচ্ছে এরকম ভবনগুলোকে নজরদারিতে রাখবে। যেখানে অনিয়ম দেখবে সেখানেই ব্যবস্থা নিবে। এক কথায় দূর্ণীতির বিরুদ্ধে আমার অবস্থান স্পষ্ট। পাশাপাশি কিভাবে নগরবাসীর নাগরিক সেবা বাড়ানো যায়, সে বিষয় নিয়েও কাজ শুরু করেছি। আমি যতদিন আছি, নিজে কোন দূর্ণীতিতে জরাবোনা এবং কাউকে দূর্নীতি করতে দিবোনা।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

সম্পাদকীয়

সম্পাদক ও প্রকাশক