তৌফিকুর রহমান তাহের, বিশেষ প্রতিনিধি সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা যত এগোচ্ছে, রাজনৈতিক সমীকরণ ততই চমকপ্রদ হয়ে উঠছে। দীর্ঘ কয়েক দশক এই জনপদ প্রয়াত জাতীয় নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের প্রভাবে আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত থাকলেও, এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সরাসরি অংশগ্রহণ না থাকায় দলটির একটি বিশাল ‘নিষ্ক্রিয়’ ভোটার ব্যাংক ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের সমর্থন পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তি ইমেজ ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদের নিজেদের বলয়ে টানছেন বিএনপি প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরী ও জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে জামায়াত প্রার্থী মোহাম্মদ শিশির মনিরের প্রচারণায় স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের সরব উপস্থিতি নিয়ে। গত ১২ জানুয়ারি রাজানগর ইউনিয়নের চকবাজারে অনুষ্ঠিত এক পথসভায় দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক গোলাপ মিয়া প্রকাশ্যেই শিশির মনিরের পক্ষে ভোট চান। তিনি বলেন, “আমরা সাধারণ ভোটার হিসেবে সেই মূল্যবান ভোট এবং উন্নয়নের চাবি শিশির মনিরের হাতে দিতে চাই।”
এছাড়া শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি বিশ্বজিত চৌধুরী নান্টু এবং হবিবপুর ইউপি চেয়ারম্যান সুবল চন্দ্র দাসের ছেলে সাবেক জেলা পরিষদ সদস্য টিকেন্দ্র চন্দ্র দাসের মতো নেতাদের জামায়াত প্রার্থীর বৈঠকে দেখা গেছে। এমনকি দিরাই পৌরসভার সাবেক মেয়র মোশারফ মিয়ার ছেলে ও উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক উজ্জ্বল মিয়াকেও জামায়াত প্রার্থীর ঘরোয়া বৈঠকে অংশ নিতে দেখা গেছে।
অন্যদিকে, এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নাছির উদ্দিন চৌধুরীর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পর্কের সুফল পাচ্ছেন এবারের নির্বাচনে। স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের অনেক নেতার সঙ্গেই তার নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। সম্প্রতি নাছির উদ্দিন চৌধুরীর শোকসভা ও উঠান বৈঠকগুলোতে দলমত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে পরিচিত ভোটাররা সরাসরি তার প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন।
দিরাই-শাল্লার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আসনে দীর্ঘকাল পর দলীয় লেবেলের চেয়ে ‘ব্যক্তি ইমেজ’ বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের পরিবারের সরাসরি কোনো প্রার্থী না থাকায় আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক এখন অভিভাবকহীন। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে বিএনপি ও জামায়াত উভয় পক্ষই ভোটারদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে হিন্দু ভোটারদের একটি বড় অংশকে নিজের পক্ষে টানতে প্রার্থীরা বিশেষ কৌশল অবলম্বন করছেন।
স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে চাপে থাকলেও এলাকায় তাদের প্রভাব ও ভোটব্যাংক এখনো অটুট। এই ভোটগুলো যে প্রার্থীর বাক্সে বেশি পড়বে, শেষ পর্যন্ত জয়ের মালা তারই গলায় ওঠার সম্ভাবনা বেশি।
উত্তপ্ত এই নির্বাচনী পরিবেশে শেষ পর্যন্ত দিরাই-শাল্লার মানুষ কার হাতে উন্নয়নের চাবি তুলে দেয়, তা দেখতে মুখিয়ে আছে পুরো জেলার মানুষ।