মোঃ ইয়াছিন মিয়া, কুমিল্লা প্রতিনিধি : কুমিল্লা নগরীসহ আশেপাশের উপজেলায় এলপি গ্যাসের অঘোষিত সংকটে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। টাকা হাতে নিয়েও প্রয়োজনের সময় গ্যাসের সিলিন্ডার না পেয়ে বিপাকে পড়ছেন হাজারো পরিবার। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে হোটেল রেস্তোরাঁ পর্যন্ত রান্নার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। অনেকেই এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরেও খালি হাতে ফিরে যাচ্ছেন।
সরকার ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার তিনশ ছয় টাকা নির্ধারণ করলেও কুমিল্লার বাজারে সেই দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ক্রেতারা জানান, খুচরা পর্যায়ে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে আঠারোশ থেকে দুই হাজার টাকায়। ক্রেতাদের অভিযোগ, অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত দাম আদায় করা হচ্ছে। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে।
শহরের টমছমব্রিজ এলাকার গৃহিণী রোকেয়া বেগম বলেন, তিন দিন ধরে গ্যাস খুঁজছি। কোনো দোকানেই সিলিন্ডার নেই। একটা দোকানে পেয়েছিলাম, দাম চাইলো উনিশশ টাকা। এত টাকা দিয়ে কিনবো কীভাবে। বাধ্য হয়ে কাঠের চুলায় রান্না করছি।
নগরীর ঝাউতলা এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সোহেল মিয়া জানান, আমার ছোট একটা খাবারের দোকান আছে। গ্যাস না পেয়ে দুই দিন দোকান বন্ধ রাখতে হয়েছে। বেশি দামে কিনলে লাভ থাকে না, আবার না কিনলে ব্যবসা বন্ধ। আমরা দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
এদিকে, এলপি গ্যাসের খুচরা বিক্রেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, কোম্পানি ও ডিলার পর্যায় থেকেই নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। সরবরাহ কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। চকবাজারের এক দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা বেশি দামে কিনলে কম দামে কীভাবে বিক্রি করবো। ডিলাররা দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, কিন্তু দায় পড়ছে আমাদের ঘাড়ে।
এদিকে, এলপি গ্যাসের ডিলারদের দাবি, তারা তাদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক এলপি গ্যাস ডিলার বলেন, আমাদের চাহিদা যদি থাকে ৫০০ এলপি সিলিন্ডারের, আমাদেরকে কোম্পানী থেকে দেয়া হয় ২০০ টি। এই কারণে আমরাও সাপ্লাই কম দিতে হচ্ছে। এছাড়া, একদিন যদি গাড়ি পাঠাই গ্যাসের জন্য, সেই গাড়ি কোম্পানীর লোক ছাড়ে ৫ দিন পর, এই কারণে আমাদের ডেলিভারী খরচও বেড়ে যায়। তাই বাধ্য হয়ে দাম বেশী রাখতে হচ্ছে।
শহরের কান্দিরপাড় এলাকার বাসিন্দা কলেজ ছাত্র রায়হান জানান, বাসায় গ্যাস না থাকায় প্রতিদিন হোটেলে খেতে হচ্ছে। এতে খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষের কষ্ট কেউ দেখছে না।
তবে, স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, অতিরিক্ত মূল্য আদায় ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাজার মনিটরিং জোরদার করার পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
কুমিল্লা জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. কাউসার মিয়া বলেন, আমরা এ বিষয়ে ডিলারদের সাথে কথা বলেছি ইতিমধ্যে৷ তারা জানিয়েছে, কোম্পানীগুলোর কাছে তারা যে চাহিদা পাঠায় সে অনুযায়ী তারা পাচ্ছে না। তবে, আমরা জেলাপ্রশাসক এ বিষয়ে ডিলার, খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতা ও কোম্পানীর প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনায় বসবো। আশা করি, আলোচনা থেকে একটা ভালো ফল আসবে। তবে, এর মধ্যে আমরা আমাদের অভিযানও পরিচালনা করছি।
দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে কুমিল্লাবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভোক্তা অধিকার রক্ষায় কঠোর নজরদারি এবং সরকারি সিদ্ধান্তের কার্যকর বাস্তবায়নই এই সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র পথ বলে মনে করছেন সচেতন মহল।