সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:১২ পূর্বাহ্ন

রাউদিয়া-সোলাকান্দা বিলের করুণ ধ্বংসযাত্রা : ইতিহাস, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও উৎপাদনশীলতার বিলুপ্তি

Reporter Name / ২২৩ Time View
Update : সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

বিশেষ প্রতিবেদক, মুন্সীগঞ্জ : মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ি থানার আরিওল ও বালিগাঁও ইউনিয়ন এবং লৌহজং থানার কলমা ইউনিয়নের মধ্যবর্তী অঞ্চলে বিস্তীর্ণ এক প্রাকৃতিক রত্ন — রাউদিয়া-সোলাকান্দার বিল। এক সময় যেখানে সবুজের চাদরে ঢাকা মাঠ, সোনালি ফসলের হাসি আর নীলাকাশ ছুঁয়ে থাকা বিস্তৃত জলাভূমি ছিলো, আজ সেখানে ঘোর অন্ধকার, কর্দমাক্ত বালু, আর অসাধুদের বুলডোজারের দাপট।

এই বিল কেবল একটি প্রাকৃতিক নিদর্শন নয়, এটি মুন্সীগঞ্জের আলু উৎপাদনের ইতিহাসের জন্মভূমি। ১৯৮৪ সালে মুন্সীগঞ্জ যখন ঢাকার অন্তর্ভুক্ত ছিল, তখনকার মানচিত্রে রাউদিয়া-সোলাকান্দা ছিলো একটি স্বীকৃত ফসলি বিল। এক সময় এই বিলেই উৎপন্ন হতো জেলার সবচেয়ে মানসম্পন্ন আলু, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিচিতি লাভ করেছিল।

কিন্তু সেই ইতিহাস আজ শুধু স্মৃতি। কারণ, দখলদারদের লোভ আর রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চলছে এক ভয়ানক পরিবেশ হত্যাকাণ্ড।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই বিলে চলে আসছে ড্রেজার মেশিন। গভীর রাত থেকে শুরু করে দিনের আলো পর্যন্ত নিরবিচারে বালু উত্তোলন চলছে। একদিকে পলিমাটি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে, অন্যদিকে জমির গভীর থেকে তোলা হচ্ছে মূল্যবান বালু। এইসব বালু বিক্রি করে একটি চক্র হয়ে উঠেছে কোটি টাকার মালিক। অথচ, এই চক্রের পেছনে আছে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, বংশগত জমিদার শ্রেণি ব্যক্তিরা।

বিলের সৌন্দর্য বিলীন, কৃষকের মুখে হতাশা এই বিলের সৌন্দর্য, প্রাণবন্ততা এবং জীববৈচিত্র্য আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। ফসলের জমি আজ পরিণত হয়েছে বালির পাহাড়ে। প্রাকৃতিক জলাধার শুকিয়ে গেছে, মাছের আকাল, পাখির আর ডানা মেলে বসা হয় না। কৃষকরা আজ হতাশ। যাদের পূর্বপুরুষেরা এই বিলে জীবন-জীবিকা গড়েছিলেন, তারা আজ চোখে জল নিয়ে দেখেন।

একজন বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষক আক্ষেপ করে বলেন : “আমার দাদা এই বিলের মাটিতেই আলু চাষ করে সংসার চালাতেন। এখন শুধু বালু, আর সেই বালু নিয়েও লড়াই।”

প্রশ্ন জাগে, দায় কার? এই চিত্র কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সারা দেশেই এমন অসংখ্য ফসলি জমি আজ বালুখনিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। কিন্তু রাউদিয়া-সোলাকান্দার বিলের ঘটনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ — কারণ এটি একটি ঐতিহাসিক কৃষিভিত্তিক অঞ্চল, যা শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, পরিবেশগতভাবেও অমূল্য।

রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল সংস্থা, পরিবেশ অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় প্রশাসন কী করছে? কেন তারা নীরব? কোথায় ভূমি রক্ষা আইন? কে দেবে কৃষকদের উত্তর?

রাউদিয়া-সোলাকান্দার বিলের এই চিত্র একটি দীর্ঘ অনুসন্ধানী রিপোর্টের শুরু মাত্র। আমরা চেষ্টা করবো পরবর্তী পর্বগুলোতে তুলে ধরতে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

সম্পাদকীয়

সম্পাদক ও প্রকাশক