প্রকৌশলী মোঃ কামাল হোসেন : গণিত ও আরবী দুই বিষয় লেটার মার্কস নিয়ে ১ম বিভাগে ১৯১৮ সালে অত্র অঞ্চলে প্রথম মেট্রিক পাশ করা গর্বিত সন্তানটি মোঃ সিরাজ উদ্দিন আহমেদ। বর্তমান পটুয়াখালী জেলাধীন দুমকি উপজেলার ২নং লেবুখালী ইউনিয়নের আঠারো গাছিয়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী শিকদার বংশে ১৯০০ সালে সিরাজ উদ্দিন আহমেদ জন্ম গ্রহণ করেন। সরকারী চাকুরিতে যোগদান করে পটুয়াখালী শহরে বসবাস করতে ১৯৩৬ সালে পটুয়াখালী শহরের কলের পুকুরের পাড় এলাকায় তৎকালীন সময়ে ৪৬০ টাকায় ৪২ শতক জমি ক্রয় করে বাড়ী করেন। বৃটিশদের শাসন আমলে পটুয়াখালীতে সরকারী চাকুরীরত অবস্থায় তিনি আঠারোগাছিয়া ইউনিয়ন বোর্ডের দুই দুই বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন। উপনিবেশ এর প্রধান করণিক হিসাবে ১৯৪৯ সালে তিনি খেপুপাড়ায় বদলী হয়। ১৯৫২ সালের মাঝামাঝি সময়ে বদলী হয়ে বরিশাল শহরে চলে যান। বরিশাল হতে রাস্ট্রীয় অধিগ্রহণ দপ্তরের সহকারী ব্যবস্থাপক হিসাবে চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালে বরিশালের বগুড়া রোডে বাড়ি করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ১৯৩৬ সালে আঠারো গাছিয়া গ্রাম থেকে প্রথমে পটুয়াখালী পরে বরিশাল শহরে স্থায়ী ভাবে বসবাস করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কিছুদিন আঠারো গাছিয়া গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। তখন তিনি গ্রামের মানুষদের আবার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় ফলে গ্রামের মানুষের শিক্ষার অভাবটি তিনি উপলব্দি করেন। একটি দাখিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য তিনি ৮০ শতক জমি দান করেন। আঠারোগাছিয়া গ্রামে তার বাড়ির পাশে প্রতিষ্ঠা করা হয় আঠারোগাছিয়া সিরাজিয়া দাখিল মাদ্রাসা। এই ক্ষণজন্মা পুরুষ, তৎকালীন সময়ে পটুয়াখালী জেলার গর্ব আমাদের আঠারোগাছিয়ার উজ্জ্বল নক্ষত্র, সিরাজ উদ্দিন আহমেদ ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে বরিশাল বগুড়া রোডের বাসায় ১৯৮২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর সময় তিনি ৫ পুত্র ও ৪ কন্যা সন্তান সহ অসংখ্য গুনগ্রাহী রেখে গেছেন। তার প্রত্যেকটি সন্তানকে তিনি উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। যারা আজ দেশের গন্ডি পেরিয়ে উন্নত দেশগুলোতেও তাদের মেধা ও যোগ্যতার মান অক্ষুন্ন রেখে চলছেন।
মোঃ সিরাজ উদ্দিন আহমেদ এর বড় ছেলে এমএম আব্দুল কাইয়ুম( সাহজাহান) বরিশাল প্রেসক্লাবের একটানা ১৪ বছর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবি ছিলেন, বাংলাদেশ সরকারের ডেপুটি এ্যাটর্নি জেনারেল হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২০ সালের ২২ নভেম্বর করোনয় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর সোবাহান বাগে নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল করেন। এমএম আব্দুল কাইয়ুম এর একমাত্র ছেলে সিনা কাইয়ুম ইউকে ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স লেভেলে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন। তিনি ইংল্যান্ডে একজন সিনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কর্মরত আছেন। দুই মেয়ের মধ্যে নিনা রহমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ তালিকাভুক্ত একটি ইনভেস্টমেন্ট ফার্মে কর্মরত আছেন। ছোট মেয়ে লিপিকা কাইয়ুম বাংলাদেশে একজন স্বনামধন্য চিকিৎসক ।
২ য় ছেলে এমএম আব্দুল হাই (আলমগীর) তিনি বরিশাল জিলা স্কুল, বিএম কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয থেকে পাশ করে, বিএম কলেজের প্রফেসর পরে মাধ্যমিক ও উচচশিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ও উপ পরিচালকের পদে চাকুরী করেন। সেখানে পরিকল্পনা উপর সিঙ্গাপুরে উচ্চতর প্রশিক্ষন লাভ করেন পরে গনশিক্ষা অধিদপতরে চাকুরী শেষে ঐচ্ছিক অবসর গ্রহন করে ব্যবসা শুরু করে নিজেকে একজন সফল ব্যাবসায়ী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মোমেনটাম মিডিয়া লিঃ এর চেয়ারম্যান ও ফার্মাশিয়া ফার্মাসিউটিক্যাল এর ভাইস চেয়ারম্যান। এমএম আব্দুল হাই (আলমগীর) বরিশালের মল্লিকা কিন্ডার গার্ডেন এর প্রতিষ্ঠাতা। তিনি শব্দাবলী গ্রুপ থিয়েটর এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও হিন্দোল ললিতকলা বিদ্যাপীঠের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। ঢাকায় বরিশাল এসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তার দুই সন্তানই আমেরিকার টেক্সাস ইউনিভার্সিটি থেকে, ছেলে হাসান মেহেদি হাই কম্পিউটার সায়েন্স ও মেয়ে তনুজা হাই শৈলী ফিজিক্স এ স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। দুজনেই আমেরিকায় গুরুত্বপুর্ন পদে চাকুরি করেন ।
৩য় ছেলে এমএম আবদুর রহীম (জাহাঙ্গীর) তিনি বরিশাল জিলা স্কুল, বিএম কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয থেকে পরিসংখ্যান বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করে লন্ডন চাকরি করেন সেখানেই স্থায়ী হয়ে বসবাস করে আসছেন। এমএম আবদুর রহীম (জাহাঙ্গীর) এর ২ ছেলে যারা জন্ম সূত্রেই যুক্তরাজ্যের নাগরিক।
৪র্থ এমএম আবদুল্লাহ ( নাসিম) বরিশাল জিলা স্কুল, বিএম কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয থেকে ফার্মেসি বিভাগে অনার্স মাস্টার্স পাশ করে কিছুদিন ফার্মেসি কাউন্সিল এর শিক্ষকতা করে, তারপর প্রথমে জার্মানী পরে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তার একমাত্র সন্তান জন্ম সূত্রেই আমেরিকার নাগরিক। সিরাজ উদ্দিন আহমেদ এর ছোট ছেলে এমএম আব্দুল আলিম ( বাচ্চু) বরিশাল জিলা স্কুল, বিএম কলেজ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পুরকৌশল বিভাগে পাশ করেন। তিনি বুয়েট এর প্রধান প্রকৌশলী পদ থেকে অবসর গ্রহন করে আমেরিকায় বসবাস করছেন।
মোঃ সিরাজ উদ্দিন আহমেদ এর ৪কণ্যা সন্তান তারাও ছিলো উচ্চ শিক্ষিত। তাদের প্রত্যেকের বিবাহ হয়েছে এক একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের উচ্চ শিক্ষিত ছেলেদের সাথে। আবদুল মান্নান সাহেবের সাথে প্রথম কন্যা বিবাহ হয়, আবদুল মান্নান বিএম কলেজের ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক ছিলেন।
২য় কন্যা সালেহা খানম এর বিবাহ হয়েছে মোঃ নুরুল হক যিনি পটুয়াখালীতে এক প্রজন্মের কাছে এ্যাডভোকেট নুরুল হক নামে পরিচিত। তিনি সরকারের প্রথম শ্রেনীর কর্মকর্তা পদে চাকুরী ইস্তেফা দিয়ে আইন পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তিনি এমএলএ ছিলেন। সালেহা খানম রত্মগর্ভা উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।
৩য় কন্যা আনজুমান আরা খানম এর বিবাহ হয় বিএম কলেজের প্রথম নির্বাচিত জিএস, ভাষা সৈনিক আবদুস সাত্তার খানের সাথে। আবদুস সাত্তার খান নরসিংদি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। আনজুমান আরা খানমও বরিশাল সদর গার্লস স্কুল ও নরসিংদি সাটিরপাড়া গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। স্বামী স্ত্রী দুজনেই উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে লন্ডনে চলে যান। আবদুস সাত্তার সেখানে মারা যান। আনজুমান আরা খানম লন্ডনে শিক্ষকতা করেন।
ছোট কন্যা কামরুননেছার বিবাহ হয় কুমিল্লার সন্তান প্রকৌশলী কাজী সোলায়মান আহমেদ এর সাথে। প্রকৌশলী কাজী সোলায়মান আহমেদ পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী হিসাবে অবসর গ্রহণ করেন।
আমরা আঠারোগাছিয়ার উন্নয়ন সোসাইটির পক্ষ থেকে এ ক্ষনজন্মা ব্যাক্তিদের স্মৃতি চারণ করে এ প্রজন্মের সন্তানদের উজ্জীবিত করতে চাই। আমরা আশাকরি হাজারো ব্যাস্ততার মাঝেও এ পরিবারের সদস্যরা এ গ্রামের শিক্ষা সহ সামাজিক উন্নয়নে দৃষ্টি রাখবেন। আল্লাহ মরহুম সিরাজ উদ্দিন আহমেদ এর ভুলত্রুটি গুলো ক্ষমা করে জান্নাতের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন
ইঞ্জিনিয়ার মোঃ কামাল হোসেন, প্রতিষ্ঠাতা আঠারোগাছিয়া ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি-এডিএস।