সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৫৫ পূর্বাহ্ন

কুমিল্লা জেলা ক্রীড়া সংস্থার কমিটি থাকলেও নেই কোনো নিজস্ব খেলাধুলা

Reporter Name / ১১৮ Time View
Update : সোমবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

কুমিল্লা প্রতিনিধি : বর্তমানে কুমিল্লা জেলা ক্রীড়া সংস্থার আহবায়ক কমিটি থাকলেও কুমিল্লার মাঠে স্থানীয় বা নিজস্ব খেলাধুলার আয়োজন নেই বললেই চলে। জাতীয় কর্মসূচির সাথে মিলিয়ে কিছু লোক দেখানো খেলার আয়োজন ব্যতিরেকে আর কোনো খেলার আয়োজন করার উদ্যোগ নিতে দেখা যায় নি এই সংস্থাটিকে। স্থানীয় খেলাধূলার আয়োজন না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয় খেলোয়াড়, সংগঠক ও ক্রীড়ামোদীরা।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সরকার দলীয়দের সাথে জেলা ক্রীড়া সংস্থার পূর্বের কমিটির লোকজনও পালিয়ে যায়। এরপর জেলা ক্রীড়া সংস্থা অরক্ষিত হয়ে পড়ে।

এছাড়াও, কুমিল্লার ক্রীড়াঙ্গনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামটিও তখন অরক্ষিত ও অনিয়মিত ব্যবহারে পড়ে ছিলো বেশ কয়েক মাস। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্দেশে জেলা ক্রীড়া সংস্থার কমিটি ভেঙ্গে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি সাত সদস্য বিশিষ্ট এডহক কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে দুইজন বাড়িয়ে কমিটির সদস্য বর্তমানে নয় সদস্যে উন্নীত করা হয়। এতে জেলার ক্রীড়ামোদীরা স্থানীয় খেলাধূলার আয়োজন নিয়ে আশাবাদী হয়ে উঠে। কিন্তু, প্রায় ৮ মাস পেরিয়ে গেলেও কুমিল্লার মাঠে কোনো স্থানীয় খেলার আয়োজন না হওয়ায় আশাব্যঞ্জক সেই উদ্দীপনা খুব দ্রুত ম্লান হতে বসেছে তাদের।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুসারে, কুমিল্লা শহরের ধর্মসাগর ও কেন্দ্রীয় ঈদগাহর মাঝামাঝি এলাকায় ‘শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়াম’ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার তত্ত্বাবধানে বহুবিধ খেলার আয়োজন করতে সক্ষম একটি বহুপাক্ষিক ভেন্যু। উইকিপিডিয়া ও স্টেডিয়াম তালিকার তথ্য অনুযায়ী, এই স্টেডিয়ামের আনুমানিক ধারণক্ষমতা ১৫–১৮ হাজার দর্শক। স্টেডিয়ামটি ভৌগোলিকভাবে শহরের কেন্দ্রে হওয়ায় স্থানীয় খেলোয়াড়দের জন্য এটি ব্যবহার উপযোগী হওয়া উচিতই ছিল। কিন্তু বাস্তবে সেটির বিপরীত চিত্র দেখা যায়।

 

এদিকে, এডহক কমিটি গঠনের পর থেকে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ গত বছর বসুন্ধরা ও আবাহনীর হোম ভ্যানু ঘোষণা দিয়েছিল কুমিল্লা শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামটিকে। এছাড়া, চলতি বছর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এই স্টেডিয়ামটিকে আবাহনী ও মোহামেডানের হোম ভ্যানু বরাদ্দ হিসেবে দিয়েছে এবং জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সমন্বয় করে এটি ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।

তবে স্থানীয় ক্রীড়াবিদরা বলছেন, স্টেডিয়ামের ব্যবহার যখন জাতীয় ক্লাবগুলোর হোম ভ্যানু হিসেবে বরাদ্দ হয়, তখন স্থানীয় ছেলেমেয়েদের নিয়মিত অনুশীলন ও টুর্নামেন্টের সুযোগ ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে, স্পোর্টিং ইউনিয়ন ক্লাবের সভাপতি মো. মাহবুবুল আলম চপল বলেন, ৫ আগষ্টের পর জেলা ক্রীড়া সংস্থার হযবরল অবস্থা হয়ে গিয়েছিল। তবে, এডহক কমিটি হওয়ার পর আমি মনে করি এখন এটি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারবে। তবে, শুধু জাতীয় খেলা নয়, কুমিল্লা স্টেডিয়ামে স্থানীয় খেলাধূলার আয়োজন করা শতভাগ প্রয়োজন। বর্ষাকালে ক্রিকেট মৌসুম না হলেও শুকনো মৌসুমে স্থানীয় ক্রিকেটের আয়োজন হবে বলে আমি আশাবাদী। আমরা খেলাপ্রিয় মানুষ, আমরা চাই আমাদের মাঠে সব ধরণের খেলার আয়োজন হোক। এটা ছাড়া বিকল্প কিছু চাই না আমরা।

জেলা ক্রিকেট কোচ ও সাবেক খেলোয়াড় হাবিব মোবাল্লেক জেমস বলেন, আমরা জেলা প্রশাসক মহোদয়কে অনুরোধ করেছি, যাতে স্থানীয় খেলাধূলার জন্য মাঠ উন্মুক্ত রাখা হয়। স্থানীয় খেলাধূলার আয়োজন করা হলে আমাদের স্থানীয় খেলোয়াড়দের মান উন্নয়ন হবে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি ৩ মাস ক্রিকেটের জন্য উন্মুক্ত রেখে স্থানীয় খেলোয়াড়দের ক্রিকেট ম্যাচের আয়োজন করা যেতে পারে। ক্রিকেটের মাঠ প্রস্তুত হলে সেখানে হকি খেলার আয়োজনও করা যাবে। আমরা চাই স্থানীয় খেলাধূলার আয়োজন বেশী হোক। বেসিক লেভেলে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও নিয়মিত ম্যাচের ব্যবস্থা না থাকলে প্রতিভাবান খেলোয়ার কিভাবে তৈরি হবে। এ বিষয়ে ক্রীড়া সংস্থা ও জেলা প্রশাসনকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।

এদিকে, স্থানীয় ক্রীড়া বিশারদ ও খেলোয়াড়রা বলছেন, জাতীয় পর্যায়ের খেলাধূলার আয়োজন হওয়ার কারণে কুমিল্লার তৃণমূল ভিত্তিক ক্রীড়া কার্যক্রম স্তব্ধ হয়ে পড়ছে। তারা জানায়, স্টেডিয়ামটি বর্তমানে জাতীয় কর্মসূচির সাথে মিল রেখে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ আয়োজনে ব্যবহার হয়ে থাকলেও স্থানীয়রা ধারাবাহিক ভাবে ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ নিয়ে, স্থানীয় খেলোয়াড় ও সংগঠকরা হতাশা ব্যক্ত করেছেন। একটি বড় খেলাধুলা ইনফ্রাস্ট্রাকচার থাকা সত্ত্বেও কুমিল্লার তরুণ প্রজন্মের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও স্থানীয় টুর্নামেন্টের অবসান হলে ক্রীড়া পরিবেশের ভেতরে নৈর্ব্যক্তিকতা বেড়ে যাবে, এই আশঙ্কায় দিন গুণছেন তারা। কিছু ক্ষেত্রে স্টেডিয়াম রেনোভেশন ও বড় টুর্নামেন্ট আয়োজনে মাঠ সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়; কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ের নিয়মিত খেলা ও অনুশীলনের জন্য নির্দিষ্ট একটি স্লট রেখে দেয়ার প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সমন্বয়ের অভাব, মাঠ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও জাতীয় বরাদ্দ নীতির অনবস্থিত বাস্তবায়ন এই তিনটি মিলেই স্থানীয় ক্রীড়াঙ্গন স্তব্ধ হচ্ছে বলে ক্রীড়ামোদী ও খেলোয়াড়রা মনে করেন। এই বিষয়ে ক্রীড়া বিশারদ ও ক্রীড়া সংগঠক বদরুল হুদা জেনু’র কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, খেলার মাঠ আমাদের। যেহেতু কুমিল্লায় আমাদের খেলার মাঠ একটি, তাই সকল খেলাধুলাই মিলেমিশে সুবিধাজনক সময়ে আয়োজন করতে হবে। বাহিরের খেলাধুলা হোক এতে আপত্তি নেই, কিন্তু সেটা হতে হবে স্থানীয় খেলাধুলার আয়োজনের পর কোন সুযোগ যদি থাকে তাহলে। আমরা কুমিল্লায় বসে বাইরের খেলা দেখা থেকেও বঞ্চিত হতে চাই না।তবে তার আগে নিজের খেলা নিশ্চিত করতে হবে।

এদিকে, মোহামেডান ও আবাহনীর হোম ভ্যানু বরাদ্দ হওয়ায় শুধু ফুটবল কেন্দ্রিক আয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় অন্যান্য ইভেন্টের খেলোয়াড়েরা। জাতীয় দুইটি দলের হোম ভ্যানু হওয়ায় সারা বছর ফুটবল উপযোগী মাঠ রাখতে হয় বিধায় এমনটি মনে করছেন তারা।

তবে, জেলা ফুটবল এসোসিয়েশন কর্মকর্তা আহসান উল্লাহ স্বপন এমন দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, কুমিল্লা স্টেডিয়াম হচ্ছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সম্পত্তি। তারা কাকে মাঠ দিবে না দিবে এটা তাদের বিষয়৷ স্থানীয় খেলাগুলোর ২/৩ টি হচ্ছে আউটডোর, বাকীগুলো ইনডোরে চালানো যায়৷ হকি, ক্রিকেট আর ফুটবল এই তিনটি আউটডোর। ক্রিকেটের জন্য চাঁদপুর ও ফেনী মাঠ নিয়ে নিয়েছে। কুমিল্লার মাঠে প্রয়োজন হলে খেলানো যাবে। আর স্থানীয় খেলা মূলত ক্লাবগুলোর উপর নির্ভর করবে। ক্লাবগুলো চাইলে এগুলোর আয়োজন করতে পারে। ক্লাব যদি ইচ্ছা প্রকাশ না করে, তাহলে কিভাবে হবে। কুমিল্লার স্থানীয় খেলোয়াড়দের আমরা বলেছি সমন্বয় করে অনুশীলন করতে। ফেডারেশন যখন ক্লাবগুলোকে খেলার জন্য জোর দিবে, তখনই স্থানীয় খেলাগুলোর আয়োজন করা যাবে বেশী৷ ফুটবলকে দিলে, ক্রিকেট খেলা যাবে না, ক্রিকেটকে দিলে হকি খেলা যাবে না এগুলো তারাই বলে যারা মূলত এই মাঠকে ব্যবহার করে বিভিন্ন কোচিং ব্যবসা করে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠক বলেন, আবাহনী ক্রীড়া চক্র লিঃ ও মোহামেডান স্পোর্টিং লিঃ এর হোম ভ্যানু হওয়ার কারণে স্থানীয় ক্রিকেট পীচ তৈরীতে বৈরী আচরণ দেখা যায়।

কুমিল্লার ফুটবল, ক্রিকেট, হকি খেলোয়াড়রা অনুশীলন করবে কোন মাঠে। তারাতো নিজের মাঠেই করবে। ক্লাবতো প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। তারাতো সাংবাৎসরিক কোন খেলার অনুশীলন করার ব্যাবস্থা করেনা, কুমিল্লায় এই সংস্কৃতি গড়ে উঠেনি। ব্যাক্তি বা কোচিং সেন্টার সারা বছর মাঠ ব্যাবহার করে যে খেলোয়াড় তৈরী করে তাদের মাধ্যমেই জেলা ক্রীড়া সংস্থার অনুমোদিত ক্লাবগুলো দল গঠন করে। কাজেই স্থানীয় খেলোয়াড়দের মাঠ ব্যাবহার করতে দিতে হবে। তা নাহলে আমরা কোথায় পাবো খেলোয়াড়। জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতির সাথে সমন্বয় করে মাঠ ব্যাবহার করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে এই জন্য, যেন কোন স্থানীয় খেলা আয়োজনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা আফাজ উদ্দিন বলেন, জেলা ক্রিয়া সংস্থার এড হক কমিটির সকল সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে মোহামেডান এবং আবাহনীর হোম ভ্যানু দেওয়া হয়েছে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামকে। তবে যারা অন্যান্য ইভেন্টে খেলে স্থানীয় পর্যায়ে, তাদের কাছ থেকে আমরা সূচি চেয়েছি তাদের সুবিধা অনুযায়ী। আমরা একটি বার্ষিক ক্যালেন্ডার এর মাধ্যমে স্থানীয় খেলার আয়োজন করব। এতে করে আশা করি স্থানীয় খেলোয়ারদেরও খেলার সুযোগ হবে।

তবে, জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সব ধরনের ক্রীড়াবিষয়ক অনুষঙ্গ সমানভাবে আয়োজন করা হবে। কুমিল্লা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আমিরুল কায়সার বলেন, জেলা ক্রীড়া সংস্থার যে নয়জন সদস্য রয়েছেন, তাদের প্রত্যেককে দিয়ে আলাদা ভাবে উপকমিটি করে দিয়েছি। ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, হকি ও অন্যান্য সকল খেলার ক্যালেন্ডার করে আয়োজন করার জন্য আমরা এই উপকমিটি করেছি। তারাই স্থানীয় খেলার আয়োজন করবেন। তারা এর উদ্যোগ নিয়েছেন। স্থানীয়ভাবে ক্রিকেট, ফুটবলসহ অন্যান্য খেলার জন্য মাঠ উন্মুক্ত। তারা যে কোনো একটি খেলার আয়োজন করে জেলা ক্রীড়া সংস্থার কাছে আবেদন করলে তাদের জন্য মাঠের দরজা সবসময় উন্মুক্ত। আমাদের মাঠ একটি, তাই সবাইকে এটা ভাগাভাগি করে খেলতে হবে। আর কোনো নির্দিষ্ট খেলার জন্য মাঠ এককভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয় নি। ফুটবল, ক্রিকেট ও অন্যান্য সকল খেলোয়াড়দের জন্য মাঠ উন্মুক্ত।

তবে, জেলা ক্রীড়া সংস্থার কমিটি, জেলা প্রশাসন ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মধ্যে স্থায়ী যোগাযোগ গড়ে উঠলে কুমিল্লার স্টেডিয়াম আবারও স্থানীয় ক্রীড়ার আসর হিসেবে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ করবে এই আশায় দিন গুণছেন ক্রীড়ামোদীরা। সমস্যা সমাধানে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতা থাকলে কুমিল্লার ক্রীড়াঙ্গন দ্রুত গতিতে ফেরত আসতে পারে। তাই এখন দরকার ইচ্ছা আর বাস্তব কর্মপন্থা, নিজস্ব টুর্নামেন্ট, যুব প্রশিক্ষণ ও স্থানীয় অ্যাক্সেস নিশ্চিতকরণ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

সম্পাদকীয়

সম্পাদক ও প্রকাশক