মো আব্দুল শহীদ, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের পাটলাই বিআইডব্লিউটিএ ঘাটে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীন নৌ পরিবহন মন্ত্রনালয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া টোল আদায় প্রতি ঘনফুট মাত্র ২৫ পয়সা। কিন্তু বাস্তবে ঘাটে ঘাটে আদায় করা হচ্ছে ১ টাকা ৩০ পয়সা। প্রশ্ন হচ্ছে এই অতিরিক্ত টাকা কোথায় যাচ্ছে? কার আশীর্বাদে চলছে পাটলাই বিআইডব্লিউটিএ ঘাটে এ প্রকাশ্য লুটপাট?
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল মাইকিং করে ঘোষণা দিয়েছিলেন, প্রতিটি ঘাটে টোল সর্বোচ্চ ৩০ পয়সা নেয়া হবে। সেই ঘোষণায় সাধারণ মানুষ ভেবেছিল অন্যায় বন্ধ হবে, চাঁদাবাজির দৌরাত্ম্য কমবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ঠিক উল্টো।
সরেজমিন গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বড়ছড়া, ছাড়াগাও, বাগলী এই তিনটি শুল্ক স্টেশন দিয়ে ভারত থেকে আসা কয়লা ও চুনাপাথর পাটলাই নদী দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে যায়। কিন্তু আজও মাঝি-মাল্লারা ৩০ পয়সা দিতে চাইলে তাদের নৌকা ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে রাখা হয়। প্রতিবাদ করলে মারধরের হুমকি দেয়া হয়। ইজারাদারদের লোকজন প্রকাশ্যেই বলে। আইন আমরা বানাই। আমাদেরকে আইন শিখায়েন না।
তাহলে কি এই দেশ আর আইনের রাষ্ট্র নেই? নাকি কয়েকজন ইজারাদারের কাছে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধির ক্ষমতাও হার মেনেছে?
মানুষের মুখে এখন একটাই প্রশ্ন এমপি সাহেবের মাইকিং কি শুধু রাজনৈতিক নাটক ছিল? জনগণকে শান্ত রাখার জন্য কয়েকদিনের অভিনয়? নাকি প্রভাবশালীদের কাছে সব প্রতিশ্রুতি হার মেনে গেছে?
জনগণ আপনাকে ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছে তাদের অধিকার রক্ষা করার জন্য, চাঁদাবাজদের প্রশ্রয় দেয়ার জন্য নয়। যদি জনগণের চোখের সামনে এইভাবে চাঁদাবাজি চলতেই থাকে, তাহলে সেই দায় শুধু ইজারাদারদের নয়-দায় নিতে হবে নীরব থাকা সবাইকে।
এখন সময় এসেছে পরিষ্কার জবাব দেয়ার। মাইকিং নয়-অবৈধ টোল বন্ধের বাস্তব ব্যবস্থা চাই। চাঁদাবাজদের আইনের আওতায় আনা হোক।
নইলে জনগণ একদিন জবাব চাইবেই এই চাঁদাবাজির রাজত্ব কার ছত্রছায়ায় চলছে।
আল্লাহ ভরসা এন্টারপ্রাইজের সুকানী সোহানুর রহমান বলেন, গত ৫ আগষ্টের পর থেকে পাটলাই নৌপথে চাঁদাবাজদের দূ্রাআত্ন্য বেড়েই চলেছে। উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বিএনপি নেতা দেলোয়ারহোসেন,বিআইডব্লিউটিএ ইজারাদার ফারুক মিয়া,যুবদল নেতা এনামুল হকের ছত্রছায়ায় এসব অপকর্ম হচ্ছে।
স্থানীয় নয়াবন্দ এলাকার কয়লা ও চুনাপাথর ব্যবসায়ি শাওন মিয়া জানান, দুটি নৌকায় করে প্রায় ছয়শত টন এলসির কয়লা নিয়ে পাটলাই বিআইডব্লিউটিএ ঘাটে আসার পর সরকার নির্ধারিত হারে টোল দিতে চাইলে তারা জোরপূর্বক আমার নৌকা আটকিয়ে রেখে ১.৩০ পয়সা আদায় করেছে। পরে বিষয়টি আমি তাহিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ আমিনুল ইসলামকে ফোন করে জানালে তথ্য প্রমাণ সহ তিনি লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন।
পাটলাই বিআইডব্লিউটিএ ইজারাদার ফারুক মিয়া বলেন, প্রতি টন কয়লা থেকে আমার নিয়োগকৃত লোকজন ৩৪.৫০ পয়সা টোল আদায় করছে। প্রতি টন কয়লা থেকে ৩৪.৫০ পয়সার স্থলে ৬০/৭০ টাকা টোল আদায়ের বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি আরও বলেন সরকার নিধারিত হারে টোল আদায় করছি। যা পারেন লিখেন।
এমবি মায়ের দোয়া নৌকার সুকানী জুয়েল মিয়া বলেন, আড়াই শত ফুট কয়লা নিয়ে পাটলাই বিআইডব্লিউটিএ ঘাটে আসার পর ইজারাদারের লোকজন আমার নৌকা আটকিয়ে ৩৪.৫০ পয়সার স্থলে ৭০ টাকা টোল আদায় করেছে। চাদাবাজি বন্ধে উপজেলা প্রশাসন লোক দেখানো মাইকিং করার পরও আরো বেপরোয়া হচ্ছে ইজারাদারের লোকজন।
ইউপি সদস্য দেলোয়ার হোসেন বলেন, পাটলাই বিআইডব্লিউটিএ ঘাটের ইজারাদার ফারুক মিয়া। অতিরিক্ত টোল এর বিষয়ে তিনি বলতে পারবেন। নদীতে আমার কোন ব্যবসা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখেন।
তাহিরপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক এনামুল হকের মোবাইল ফোন বার বার কল করেও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। তাই বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
তাহিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ আমিনুল ইসলাম বলেন,পাটলাই বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে শাওন মিয়া নামের একজন লোক আমাকে ফোন দিয়ে অতিরিক্ত টোল আদায়ের বিষয়ে জানানোর পর লিখিত অভিযোগ করতে বলেছি। কিন্তু এখনও কোন অভিযোগ পাইনি। পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তাহিরপুর উপজেলা নিবাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক বললেন, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে চাঁদাবাজি বন্ধে এবং ৩০ পয়সা টোল আদায়ে নদীতে মাইকিং করেছি। কিছুদিন আগেও বিআইডব্লিউটিএ ইজারাদারদের ডেকে বলেছি সরকার নিধারিত হারে টোল আদায় করার জন্য। সুনামগঞ্জে বিআইডব্লিউটিএ অফিস না থাকায় চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমি লোক পাঠাচ্ছি দেখে ব্যবস্থা নেবে।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়ার মুঠোফোনে বার বার কল করার পরও কোন উত্তর পাওয়া যায়নি। তাই বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।