সুরঞ্জন তালুকদার, মধ্যনগর প্রতিনিধি : আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার হাওরাঞ্চলে বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার প্রভাব এখন পড়েছে কৃষকের গোয়ালঘরে। ঘরে ধান না ওঠার পাশাপাশি গরুর প্রধান খাদ্য খড়ও নষ্ট হয়ে যাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। গবাদিপশুর খাবারের অভাবে অনেকেই কম দামে গরু বিক্রি করে দিচ্ছেন।
উপজেলার বিভিন্ন হাওরপাড়ের গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, কৃষকরা পচে যাওয়া ধান ও খড় শুকিয়ে কোনোভাবে সংরক্ষণের চেষ্টা করছেন। কিন্তু অধিকাংশ খড় পানিতে পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তা গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহার করা নিয়েও সংশয়ে রয়েছেন তারা। ফলে বছরের বাকি সময় গরুকে কী খাওয়াবেন, সেই দুশ্চিন্তায় অনেকে আগেভাগেই গরু বিক্রি করছেন।
উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের কৃষক এমদাদ মিয়া বলেন, ধান তো গেলই, খড়ও রইল না। গরু রাখলে খাওয়াব কী? তাই বাধ্য হয়ে কম দামে গরু বিক্রি করে দিচ্ছি। তিনি জানান, প্রায় ১ লাখ টাকা দামের একটি গরু ৮৫ হাজার টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে তাকে।
অন্যদিকে আনোয়ারপুর গ্রামের কৃষক হোসেন মিয়া বলেন, সারা বছর গরু লালন-পালন করি লাভের আশায়। কিন্তু এবার খড় না থাকায় গরু বাঁচানোই কঠিন হয়ে গেছে। বাজারে অনেক কৃষক একসঙ্গে গরু বিক্রি করতে আসায় দামও কমে গেছে।
সড়কের পাশে পচা খড় শুকাচ্ছিলেন কৃষক জয়নাল আবেদীন ও তার স্ত্রী। জয়নাল আবেদীন বলেন, তিন একর জমির মধ্যে এক একর ২৮ শতাংশ ডুবে গেছে। খড় সব পচে গেছে, খড়ের অবস্থা দেখছেনই তো। এই খড় গরুও খাবে না। তবুও তুলে নিচ্ছি। কিছুই না পেলে হয়তো খেতেও পারে। ৯০ হাজার টাকা দামের তিনটি গরু ৬৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছি। শুধু আমি নই, অনেক গৃহস্থের একই অবস্থা।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত বোরো মৌসুমে যে খড় সংগ্রহ করা হয়, তা দিয়েই সারা বছর গবাদিপশুর খাদ্যের বড় অংশের চাহিদা পূরণ হয়। কিন্তু এবার আগাম বন্যায় খড় নষ্ট হওয়ায় কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কেউ সংসারের খরচ চালাতে, আবার কেউ গোখাদ্যের সংকটের আশঙ্কায় গরু বিক্রি করছেন।
মধ্যনগর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল বাশার বলেন, হাওরপাড়ের অনেক কৃষক এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কেউ নৌকায় করে গরু বাজারে নিয়ে বিক্রি করছেন। গরু পালন চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, এ অবস্থায় সরকারিভাবে কৃষকদের জন্য গোখাদ্য সহায়তা ও সহজ শর্তে কৃষিঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। তা না হলে অনেক কৃষক আগামী মৌসুমে কৃষিকাজ চালিয়ে যেতে পারবেন না।
উপজেলার বংশীকুন্ডা দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, বর্তমানে গোখাদ্যের যে সংকট তৈরি হয়েছে, তাতে গরু ধরে রাখলে আরও লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। ঠিকমতো খাবার না পেলে গরুর ওজন কমে যাবে এবং পরবর্তীতে আরও কম দামে বিক্রি করতে হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. রাকীব মাহমুদ মাসুম বলেন, এখনো উপজেলায় বড় ধরনের গোখাদ্য সংকট তৈরি হয়নি। তবে কোরবানির ঈদ সামনে থাকায় অনেক কৃষক আগেভাগেই গরু বিক্রি করছেন বলে আমরা ধারণা করছি