এম আই আকাশ, বোদা,পঞ্চগড় : কথিত আছে একজন নারীর নিজস্ব কোন ঘর থাকেনা। বাবার বাড়ি আর স্বামীর বাড়ির লোকজনের মন যুগিয়ে চলাই যেন তার জীবনের লক্ষ্য। আধুনিক বিশ্বে বিশেষ শ্রেণীতে এমনটি মনে না হলেও অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের জীবন যে এই গোলকধাঁধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ তেমনই একজন হতভাগ্য নারী হলেন মহিজা আক্তার খুকি। যিনি শত অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেও স্বামী সন্তান নিয়ে ঘর করে যেতে চাইছিলেন। কিন্তু শেষ পরিনতি যে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যেতে পারে সে বিশ্বাস হয়তো করতে পারেননি মহিজা আক্তার খুকি।
পঞ্চগড়ের বোদায় বুধবার ১৫ অক্টোবর এমনই এক মর্মান্তিক ঘটনা স্তব্ধ করেছে এলাকাবাসী সহ সমাজবাদীদের।
জানা যায়, উপজেলার মাড়েয়া ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ড সর্দারপাড়া এলাকার বাসিন্দা জুলফিকার আলীর হাতে দীর্ঘদিন ধরে পাশবিক নির্যাতনের স্বীকার হয়ে স্ত্রী মহিজা আক্তার খুকি (৩২)’র মৃত্যু হয়েছে।
নিহত খুঁকির পরিবার জানায়, ১১ বছর আগে জুলফিকার আলীর সাথে মুনিয়ারা খুঁকির বিয়ে হয়। তাদের সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ে সন্তান রয়েছে। বিয়ের পর থেকেই কারণে অকারণে খুঁকির উপর নির্যাতন করতো জুলফিকার ও তার পরিবারের সদস্যরা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় খুঁকির অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে প্রথমে বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও পরে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাত দেড়টায় সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান খুঁকি। বুধবার সকালে তার পরিবারকে খবর দেয়া হয় ডায়াবেটিস শূন্য হয়ে মারা গেছেন খুঁকি। খুঁকির পরিবারের সদস্যরা মরদেহের গোসল দেয়ার সময় শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে হট্টগোল শুরু করে দাফন কাফনের কাজ অসমাপ্ত রেখে পুলিশে খবর দেয়া হয়, পালিয়ে যান স্বামী জুলফিকার।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে।
খুঁকির বাবা মহিদুল ইসলাম বলেন, বিয়ের পর থেকেই আমার মেয়েকে কারণে অকারণে নির্যাতন করতো জুলফিকার ও তার পরিবারের সদস্যরা। আমার মেয়েকে নির্যাতন করে হত্যা করেছে ওরা। আমি এর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
খুঁকির চাচা সামিউল ইসলাম বলেন, জুলফিকারের নির্যাতনের কারণে তার প্রথম স্ত্রী চলে গেছে। আমার ভাজতিকে দীর্ঘদিন ধরেই মারপিট করে আসছিল। আমরা স্থানীয় মানুষ ও খুঁকির মেয়ের কাছে জানতে পেরেছি তাকে দুই দিন ধরে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে। দুই দিন ধরে তাকে খেতে দেয়া হয়নি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মশিয়ার রহমান প্রধান বলেন, ওই গৃহবধূকে মাঝে মধ্যেই মারধর করতো তার স্বামী জুলফিকার আলী। মঙ্গলবার খুুকি অসুস্থ্য হয়ে পড়লে তাকে প্রথমে বোদা হাসপাতালে এবং পরে সেখান থেকে তাকে স্থানান্তরিত করা হয় ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাতে মারা যান তিনি। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে জুলফিকারকে জামায়াত নেতা হিসেবে অবহিত করে হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দিতে তড়িঘড়ি করে দাফন সম্পন্ন করতে চেষ্টা করার অভিযোগে অনেকেই পোস্ট করেছেন। তবে ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি হামিদুল্লাহ বলেন, দলীয় কোন পদে নেই জুলফিকার।
বোদা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিম উদ্দিন বলেন, ওই গৃহবধূর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তার পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার প্রক্রিয়া চলছে এবং তার স্বামী পলাতক রয়েছেন।