এম আই আকাশ, বোদা,পঞ্চগড় : পঞ্চগড়ে স্বল্প পূঁজিতে লেবু চাষ করে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন দেবীগঞ্জ উপজেলার টেপ্রিগঞ্জ ইউনিয়নের বানেশ্বর পাড়া গ্রামের কমপক্ষে ৩০ জন কৃষক। অল্প খরচে অধিক লাভবান হওয়ায় লেবু চাষ এখন ওই গ্রামের প্রধান আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।
সোমবার ২০ অক্টোবর সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়—সম্পূর্ণ গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ছোট-বড় মিলিয়ে ২৫টিরও বেশি লেবুর বাগান। এছাড়াও বাড়ির উঠান থেকে শুরু করে রাস্তার ধার, পরিত্যক্ত উঁচু জায়গা সহ এলাকার পুরো কৃষি জমিতেই চাষ করছেন লেবু। চাষিদের মুখে এখন স্বাবলম্বিতার স্বপ্ন, জমিতে সবুজ লেবুর বাগান যেন সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ।
এই গ্রামে তিন ধরনের লেবুর চাষ হয়ে থাকে, যা স্থানীয়ভাবে এলাচি, কলম্বো ও কাগজিলেবু নামে পরিচিত। এলাচি জাতের লেবু আকারে বড় ও সুগন্ধী, বিচি কম এবং সারা বছরই ফলন হয়।
জানা যায়, “লেবুর চারা রোপণের আট থেকে নয় মাস পর থেকেই ফলন আসা শুরু করে। প্রতিটি গাছ থেকে বছরে গড়ে দুই হাজারটি লেবু পাওয়া যায়। প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর অন্তর গাছ থেকে লেবু তোলা যায়। প্রতি বিঘা বাগান থেকে ১৫ দিন অন্তর অন্তর প্রায় ৪ হাজার লেবু তোলা যায়। বর্তমানে প্রতি শত লেবু প্রায় ৪০০ টাকা দরে ঢাকা কারওয়ান বাজার থেকে আগত ব্যবসায়ীরা কিনে নিয়ে যায়।”
কলেজ শিক্ষার্থী ও লেবু চাষী রেজাউল ইসলাম বলেন, “একটি লেবুর বাগান থেকে সাত-আট বছর পর্যন্ত লেবু পাওয়া যায়। এখন আমাদের গ্রামের প্রায় সবাই লেবু চাষ করতেছে। যদি সরকারীভাবে উন্নত জাতের চারা সরবরাহ, লেবু চাষের উপর প্রশিক্ষণসহ প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যায়, তাহলে আমরা আরও অধিক লেবু চাষ করতে পারব।
স্থানীয় কৃষক কাউসার আলমের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কারমাইকেল কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে মাস্টার্স শেষ করে তিনি চাকরির পিছনে না ছুটে কৃষিকাজে যুক্ত হন। চাকরির আশায় সময় নষ্ট না করে ধান ও ভুট্টা আবাদের পাশাপাশি লেবুর বাগান তৈরির উদ্যোগ নেন। বর্তমানে তিনি সোয়া তিন বিঘা জমিতে চার শতাধিক লেবু গাছের একটি বাগান গড়ে তুলেছেন, যা এখন তাদের প্রধান আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। তিনি এখন তিন সন্তান এবং স্ত্রী নিয়ে অত্যন্ত সুখেই জীবনযাপন করছে বলে জানা যায়।
লেবু চাষী ও এলাকাবাসীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতি বিঘা জমি থেকে বছরে এক থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ হচ্ছে। যা অন্যান্য ফসলের তুলনায় অনেক বেশি লাভজনক। শুধু নিজ পরিবার নয়, এলাকার বেকার শ্রমিকরাও এ বাগানে কাজ করে আয় রোজগার করছেন।
স্থানীয় শ্রমিক মোহাম্মদ রাশেদ বলেন, “লেবুর সময় দুই মাস টানা কাজ থাকে। তখন আমাদের কাজের বড় সুযোগ হয়। ”
কৃষি দপ্তরের তদারকির বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে কাউসার আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বর্তমানে এই ওয়ার্ডে কোন কৃষি কর্মকর্তা দায়িত্বে আছেন আমার জানা নেই। তবে একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রবীর কুমার রায় গতবছর লেবু বাগানের নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছেন ।”
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নাঈম মোর্শেদ বলেন, “উপজেলায় বর্তমানে ১২.৫ হেক্টর জমিতে লেবুর চাষ করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে লেবু চাষীদের লেবু চাষে উদ্ধুদ্ধ করা হচ্ছে। লেবু চাষে মাটি পরীক্ষা, জমি নির্বাচন, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, উন্নত জাতের চারা রোপন, ভালো পরিচর্যা, রোগ বালাই ও পোকামাকড় দমনে পরিবেশ বান্ধব কৌশল নিয়ে আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে থাকি। লেবু চাষ এখন আর শুধু পারিবারিক চাষ নয় বরং পরিকল্পিত ভাবে করলে এটি হতে পারে অর্থনৈতিক মুক্তির পথ।
তিনি আরও জানান, জনবল সংকট থাকার কারণে টেপ্রিগঞ্জ ইউনিয়নে ৩ জন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা বদলে ১ জনকে দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে হচ্ছে। ফলে তদারকির সমস্যা হতে পারে তবে চলতি মাসেই উক্ত ইউনিয়নে আরও একজন কর্মকর্তাকে পোস্টিং দেয়া হবে।
উল্লেখ্য যে, বানেশ্বর পাড়া গ্রামে কাউসার আলম, মরতু তালুকদার,সালাম আলী, হাসেন আলী, শামসুল তালুকদার, ওমর ফারুক সহ আরও অনেক কৃষক লেবু বাগান করেছেন, যাদের লক্ষ্য লেবু চাষ করে একটি স্থায়ী আয়ের উৎস তৈরি করা।