তৌফিকুর রহমান তাহের, বিশেষ প্রতিনিধি সুনামগঞ্জ : সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে কোন্দল ও গ্রুপিং চরমে পৌঁছেছে। এর জের ধরে একাধিক পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠনের ঘটনা ঘটেছে। মানুষ গড়ার কারিগরদের এমন দলাদলি ও নেতৃত্ব দখলের লড়াই নিয়ে সাধারণ শিক্ষক ও স্থানীয় সুশীল সমাজের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শাল্লা উপজেলায় বর্তমানে ১০৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট ৪৪০ জন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। অথচ তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ইতোমধ্যে অন্তত তিনটি পৃথক সমিতি দাঁড়িয়ে গেছে।
নতুন কমিটি (বাংলাদেশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি): গত ১৮ জুলাই উপজেলা শহীদ মিনারের সামনে এক সাধারণ সভার মাধ্যমে ১০১ সদস্যবিশিষ্ট শাল্লা উপজেলা শাখার নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে লক্ষীপাশা সপ্রাবি’র প্রধান শিক্ষক মনোজ কান্তি সরকারকে সভাপতি এবং সুলতানপুর সপ্রাবি’র সহকারী শিক্ষক মোস্তাক মিয়াকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়।
পূর্বের কমিটি (বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি – কাসেম-শাহীন) চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি শাহীদ আলী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে সুব্রত কুমার দাশকে (প্রধান শিক্ষক, প্রতাপপুর সপ্রাবি) সভাপতি এবং সুদীপ্ত কুমার দাসকে (প্রধান শিক্ষক, সহদেবপাশা সপ্রাবি) সাধারণ সম্পাদক করে ৫১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
প্রধান শিক্ষকদের পৃথক সমিতি প্রধান শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত অপর একটি সমিতিও উপজেলায় সক্রিয় রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের শেষদিকে সম্মিলিতভাবে শিক্ষক সমিতি গঠনের উদ্যোগ নেয়া হলেও ‘চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত’ শিক্ষকদের বাদ দেয়া এবং জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের না জানানোর অভিযোগ ঘিরে দ্বন্দ্বের সূচনা হয়।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির (কাসেম-শাহীন) উপদেষ্টা ও ডুমরা রসিকলাল সপ্রাবি’র প্রধান শিক্ষক লোকেশ দাশের দাবি, সমিতি গঠনের সময় তাঁকে না জানিয়েই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, যা থেকে গ্রুপিংয়ের সূত্রপাত। যদিও উপজেলা প্রধান শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকুর রহমান জানান, বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী সময়ে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, নতুন কমিটির সভাপতি মনোজ কান্তি সরকার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “আড়াই থেকে তিন শতাধিক শিক্ষকের উপস্থিতিতেই নিয়ম মেনে কমিটি করা হয়েছে। সদস্য সংখ্যা নির্ভর করে মোট শিক্ষকের ওপর।” তবে বিপরীত গ্রুপের সভাপতি সুব্রত কুমার দাশ নতুন এই কমিটিকে ‘অবৈধ’ দাবি করে জানান, এমন বিভাজন শিক্ষকদের সম্মান ক্ষুণ্ণ করছে।
শিক্ষকদের এমন কোন্দলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক প্রবীণ ও সাধারণ শিক্ষক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রবীণ শিক্ষক হতাশা প্রকাশ করে বলেন, শিক্ষকরা সমাজকে সুশিক্ষা দেন। তাঁরাই যদি স্বার্থ ও নেতৃত্বের লোভে গ্রুপিংয়ে জড়ান, তবে সমাজকে কী বার্তা দেয়া হচ্ছে? গ্রুপিংয়ের দ্বন্দ্ব এখনই না থামালে লাগামছাড়া হয়ে পড়বে।
শাল্লা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পরিমল কুমার ঘোষ এ বিষয়ে বলেন, “শিক্ষকদের মধ্যে এমন গ্রুপিং সত্যিই দুঃখজনক। তবে একাধিক সংগঠন করার স্বাধীনতা তাঁদের রয়েছে। খেয়াল রাখা হচ্ছে যেন এই দ্বন্দ্বে বিদ্যালয়ের পাঠদান বা অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। শিখন কার্যক্রমে গাফিলতি হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।