বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:২৮ পূর্বাহ্ন

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শুধু নাম নয়, একটি ইতিহাস

Reporter Name / ১০৬ Time View
Update : রবিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬

‘মঈনুল হাসান রতন’

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমান শুধু একটি নাম নয়, তিনি একটি ইতিহাস। জীবিত অবস্থায়ও তিনি যেমন এ দেশের মানুষের ভালোবাসায় ধন্য ছিলেন, শত ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচার সত্ত্বেও শাহাদাতবরণের চার দশক পরও তিনি এদেশের মানুষের মনিকোঠায় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আসনে আসীন হয়ে আছেন।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের এক অবিসংবাদিত নেতা। জাতির চরম ক্রান্তিকালে যার কন্ঠে উচ্চারিত হয়েছিলো স্বাধীনতার ঘোষণা। অস্ত্র হাতে জীবনবাজি রেখে যিনি মুক্তিযুদ্ধে রণাঙ্গণে সেক্টর কমান্ডার হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। যার নামের আদ্যাক্ষর নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে গড়ে ওঠেছিল প্রথম ব্রিগেড জেড ফোর্স। একজন সংগঠক ও রণাঙ্গণের অকুতোভয় যোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে যিনি অর্জন করেছেন জীবিত যোদ্ধাদের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ বীর উত্তম খেতাব।

বাবা-মায়ের আদরের সন্তান বগুড়ার কমল জাতির প্রিয় জিয়াউর রহমান একজন সফল সেনানায়ক ছিলেন। ইতিহাসে হাতেগোনা যে কয়জন সামরিক অফিসার দেশের জন্য দু-দুটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে লড়াই করার গৌরব অর্জন করেছেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাদের একজন। তিনি ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে এবং ১৯৭১ সালে মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং এর অন্যতম সংগঠক হিসেবে পুরোভাগে থেকে নেতৃত্ব দেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনীর বর্বর হত্যাকান্ডের পর দিশেহারা জাতিকে দিকনির্দেশনা দেন তখনকার সেনাবাহিনীর মেজর জিয়াউর রহমান। তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসে বিদ্রোহ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এরপর চট্টগ্রামে স্থাপিত অস্থায়ী বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা দেন। দেশকে স্বাধীন করতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। ২৭ ও ২৮ মার্চ তার এ ঘোষণা বেতারকেন্দ্র থেকে বারবার প্রচারিত হয়। তার উদাত্ত আহ্বানে মুক্তিপাগল দেশবাসী আশার আলো খুঁজে পেয়েছিল এবং অস্ত্র হাতে শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলো। তারপর দীর্ঘ ২৬৬ দিনের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ তাজা প্রাণের রক্ত ও ৩ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বাঙালির গর্ব এ মহান মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমান ১৯৭১ সালের জুন পর্যন্ত ১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক এবং পরে জেড ফোর্স- এর প্রধান হিসেবে দুঃসাহসী সেনানায়কের একটা আলাদা পরিচয় অর্জন করেন। যোদ্ধা ও একজন সংগঠক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি একজন সেনানায়ক হিসেবে জিয়া যেমন সফল ছিলেন, তেমনি একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেও। তিনি ছিলেন স্বনির্ভর ও আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার। স্বাধীনতা বাঙালির জীবনের শ্রেষ্ঠতম অর্জন। একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে আমাদের এ স্বাধীনতা। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায় বিচার এই তিনটি মূল্যবোধকে সামনে রেখেই হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। যেখানে জনগণই হবে সকল ক্ষমতার মূল উৎস। জাতির এ চরম দুর্দিনে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তে দেশে বাকশাল নামক একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করা হয়। জাতির বহুল প্রত্যাশিত মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মূল চেতনা বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সমাধি রচনা করা হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর নানা ঘটনার প্রবাহের মধ্য দিয়ে ৭ নভেম্বর সংঘটিত সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা ও রাজনীতির কেন্দ্রভূমিতে আসার সুযোগ লাভ করেন। তার সময়োচিত দায়িত্বভার গ্রহণের ফলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা পায়।

১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম স্বেচ্ছায় জিয়াউর রহমানের কাছে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার অর্পণ করেন। এভাবেই সেনানায়ক থেকে জিয়া একজন রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার প্রতি দেশের জনগণের আস্থা ও সমর্থন আছে কী না, তা যাচাইয়ের জন্য জিয়াউর রহমান দেশে একটি গণভোটের আয়োজন করেন।

১৯৭৭ সালের ৩ মে সেই ভোট অনুষ্ঠিত হয় এবং জনগণ বিপুল ভোটের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার প্রতি সমর্থন ও আস্থা প্রকাশ করেন। ১৯৭৮ সালের ৩ জুন তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আয়োজন করেন। এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ ভোটে প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। এ নির্বাচনে দশ জন প্রার্থী অংশ নেয়। জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিয়াউর রহমান বিপুল ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

বাংলাদেশকে একদলীয় স্বৈরশাসনের কবল থেকে মুক্ত এবং বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন জিয়াউর রহমানের এক অসামান্য অবদান। তার উদ্যোগে ১৯৭৬ সালে জারিকৃত ‘রাজনৈতিক-দলবিধি আদেশ’ এর আওতায় প্রথমে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলসহ ২১টি রাজনৈতিক দল সরকারি নিবন্ধন লাভ করে। পরে এ সংখ্যা আরো বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের সময় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে মুজিব সরকারের আমলে সংবাদপত্রের উপর আরোপিত বিধি-নিষেধ জিয়াউর রহমানের সময় প্রত্যাহার করে এর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। সংবাদপত্র শিল্পের বিকাশের জন্য তিনি নানা ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ প্রবর্তনের মাধ্যমে জাতিকে নতুন পরিচয়ে পরিচিত করেন। বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মের ও মতের নানা জাতিগোষ্ঠী বসবাস করে। তাদের সংস্কৃতি, জীবনযাত্রার মাত্রা ও ধরণ একে অপরের থেকে ভিন্ন। তাই জিয়াউর রহমান মনে করতেন যে, ভাষা বা সংস্কৃতির ভিত্তিতে নয়, ভূখন্ডের ভিত্তিতেই জাতীয়তাবাদকে গ্রহণ করা উচিত। তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের ঐক্য ও সংহতির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন এবং এই ধারণা জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার শক্তি হিসেবে বাংলাদেশে দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

সম্পাদকীয়

সম্পাদক ও প্রকাশক