‘তানভীর আজাদ’
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১/১১ ছিল এক ভয়াবহ ও অস্বাভাবিক অধ্যায়। সে সময় রাজনীতিবিদদের জন্য ‘পাঠশালা’ গড়ার কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত তা টেকেনি। বরং দেশ দেখেছে দলবিহীন নির্বাচন, রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রতিহিংসামূলক রাজনীতির বিস্তার। একই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর আবারও একটি অনির্বাচিত সরকারের সূচনা হয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় পুনরায় ভরসা রাখা হয় সুশীল সমাজের ওপর। যে প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এই পরিবর্তন হয়েছিল, তা অল্প সময়ের মধ্যেই হতাশায় রূপ নিতে শুরু করে। জনগণ নতুন শিল্প-সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক চর্চার স্বপ্ন দেখলেও বাস্তবে লক্ষ্য করা যায় মব-সংস্কৃতি, অসামাজিক কার্যকলাপ এবং তরুণ সমাজের একাংশের দিশেহারা অবস্থান। দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের বদলে রাষ্ট্র যেন আরও অনিশ্চিত পথে এগোচ্ছে। বর্তমান ইউনুস সরকারও অতীতের অনির্বাচিত সরকারগুলোর মতোই জনগণের সামনে স্পষ্ট না করে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। বন্দর করিডর সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যু এখনও অস্পষ্ট রয়ে গেছে। এর মধ্যেই জাতীয় সংগীত পরিবর্তন, ১৬ ডিসেম্বর অস্বীকারের মতো বিতর্কিত বক্তব্য এবং বাংলাদেশ의 শিল্প-সংস্কৃতি বদলে দেওয়ার নানা উদ্যোগ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিকভাবে সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ বর্তমান বাস্তবতায় অরাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, বরং রাজনৈতিক নেতৃত্বই রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যকর বিকল্প। ১৯৭১-পরবর্তী বাংলাদেশ রাষ্ট্রে এরশাদের ৯ বছর ও মইনুদ্দিন–ফখরুদ্দিন সরকারের প্রায় ২ বছর ছাড়া বাকি সময় রাষ্ট্র পরিচালিত হয়েছে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মাধ্যমে। বিকল্প কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এখনো দৃশ্যমান নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় এবং দলটি আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় বিএনপি ছাড়া সরকার গঠনের মতো অবস্থানে অন্য কোনো দল নেই। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানসহ একাধিক বিশ্লেষক প্রকাশ্যে বলেছেন, নির্বাচন হলে বিএনপি বিপুল ভোটে জয়লাভ করে সরকার গঠন করতে পারে। আওয়ামী লীগের পতনের পর জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে যেসব অস্বাভাবিক রাজনৈতিক দাবি উত্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো মূলত নির্বাচন প্রক্রিয়া বিলম্বিত বা বানচাল করার কৌশল হিসেবেই দেখছেন অনেকে। এই পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি গত এক বছরে তুলনামূলকভাবে পরিপক্ক ও দূরদর্শী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। দীর্ঘদিনের নির্বাসিত জীবন তারেক রহমানকে আরও অভিজ্ঞ ও বাস্তববাদী রাজনীতিক হিসেবে গড়ে তুলেছে বলেও মত বিশ্লেষকদের। তার দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে রাজনীতির দৃশ্যপট দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে—এমন ধারণাও জোরালো হচ্ছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্রের যে পথ উন্মুক্ত করেছিলেন, সেই ধারাবাহিকতা তারেক রহমান বজায় রাখতে পারবেন কি না, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কারণ মতপার্থক্য ও বিরোধ থাকা সত্ত্বেও বর্তমান বাস্তবতায় দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক শক্তিকেই বিএনপির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুযোগ কেউ বারবার পান, কেউ পান মাত্র একবার—তারেক রহমানের সামনে সেই সুযোগই এখন উপস্থিত। প্রশ্ন একটাই, তিনি কি আগামীর বাংলাদেশের নেতৃত্বের জায়গা দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন—তার উত্তর দেবে সময়।
তানভীর আজাদ
প্রকাশক Daily news 10 online