বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৩০ পূর্বাহ্ন

বেগম খালেদা জিয়ার এক জীবন

Reporter Name / ১৯০ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫

‘মৃধা মোঃ আল আমিন’

ইতিহাস সব মানুষকে সমানভাবে মনে রাখে না। কিছু মানুষ সময়ের ভিড়ে মিলিয়ে যায়, আবার কিছু মানুষ সময়কে অতিক্রম করে ইতিহাসে পরিণত হয়। বেগম খালেদা জিয়া তেমনই এক জীবন—যাঁর অস্তিত্ব কেবল ব্যক্তিগত জীবনের পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে মিশে গিয়েছিল। তাঁর জীবন ছিল রাষ্ট্রের উত্থান-পতনের নীরব সহযাত্রী, গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক অবিচ্ছিন্ন অনুষঙ্গ।

তিনি রাজনীতির পথে এসেছিলেন কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে নয়। বরং ব্যক্তিগত জীবনের এক গভীর শোক ও দায়িত্ববোধ তাঁকে ঠেলে দিয়েছিল জনজীবনের কঠিন বাস্তবতায়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রয়াণের পর, একটি অনিশ্চিত সময়ে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন ইতিহাসের সামনে—নীরব অথচ দৃঢ়, সংযত অথচ অনমনীয়। সেদিন তিনি বুঝেছিলেন, কখনো কখনো ব্যক্তি নিজে সিদ্ধান্ত নেয় না; সময়ই সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যক্তিকে সামনে নিয়ে আসে।

আশির দশকের অস্থির ও সংকটময় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেগম খালেদা জিয়া ধীরে ধীরে পরিণত হন গণতন্ত্রকামী মানুষের আশ্রয়স্থলে। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তিনি ছিলেন দৃঢ় কণ্ঠস্বর, কিন্তু সেই কণ্ঠে ছিল না উগ্রতা—ছিল স্থির প্রত্যয়। আন্দোলন, সংগঠন ও রাজনৈতিক ধৈর্যের সমন্বয়ে তিনি এক নতুন নেতৃত্বের ভাষা নির্মাণ করেন, যেখানে দৃঢ়তা ছিল, কিন্তু অমর্যাদা ছিল না।

১৯৯১ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। দীর্ঘ বিরতির পর সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়, এবং বেগম খালেদা জিয়া দায়িত্ব গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। তিনি কেবল বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি হয়ে ওঠেন এ অঞ্চলের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর নেতৃত্বে রাষ্ট্র আবার ফিরে পায় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা। গণতন্ত্র তখন আর কেবল একটি ধারণা নয়, বরং একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

ক্ষমতার আসনে বসেও তিনি নিজেকে ক্ষমতার অহংকারে ভাসিয়ে দেননি। তাঁর নেতৃত্বে ছিল সংযম, বক্তব্যে ছিল ভারসাম্য এবং সিদ্ধান্তে ছিল দৃঢ়তা। রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি বিশ্বাস করতেন ধারাবাহিকতায়, হঠকারিতায় নয়। তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ছিল—রাষ্ট্র ব্যক্তির ঊর্ধ্বে, এবং ক্ষমতা একটি দায়িত্ব, কোনো অলঙ্কার নয়।

পরবর্তী সময়ে আবার তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সময়ে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজেছে আত্মবিশ্বাস ও স্থিরতার সঙ্গে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে তিনি বাংলাদেশের পরিচয় তুলে ধরেছেন মর্যাদা ও আত্মসম্মানের সঙ্গে। রাজনীতির উত্তাল স্রোতের মাঝেও তিনি নিজের অবস্থান বজায় রেখেছেন স্থিরতায়—যেন প্রবল ঢেউয়ের মাঝেও এক দৃঢ় নোঙর।

জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে তাঁর উপস্থিতি ক্রমশ নীরব হয়ে ওঠে। শারীরিক দুর্বলতা তাঁকে সরিয়ে দেয় সরাসরি রাজনীতির মঞ্চ থেকে, কিন্তু ইতিহাসের কেন্দ্র থেকে নয়। কখনো কখনো নীরবতা ভাষণের চেয়েও গভীর হয়ে ওঠে—আর তাঁর নীরব উপস্থিতি তেমনই এক গভীর অর্থ বহন করছিল। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, নেতৃত্ব কেবল মাইক্রোফোনে নয়, ধৈর্য ও সহনশীলতার মধ্যেও প্রকাশ পায়।

বেগম খালেদা জিয়ার জীবন ছিল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গঠিত এক পরিণত আত্মা। তিনি ছিলেন এমন এক নারী, যিনি প্রতিকূলতার মুখেও নিজস্ব মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখেছেন। ক্ষমতার উচ্চতায় যেমন তিনি সংযত ছিলেন, তেমনি নিভৃত সময়েও ছিলেন দৃঢ় ও স্থির। তাঁর রাজনৈতিক যাত্রা কোনো সরল রেখা নয়; বরং তা ছিল বাঁক, বিরতি ও গভীরতার সমন্বয়ে নির্মিত এক দীর্ঘ পথচলা।

এই জীবন আমাদের শেখায়—রাজনীতি কেবল ক্ষমতার খেলা নয়, এটি ধৈর্য, ত্যাগ ও দায়িত্বের সাধনা। বেগম খালেদা জিয়া সেই সাধনার মধ্য দিয়েই নিজেকে ইতিহাসে স্থাপন করেছেন। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কিছু মানুষ ক্ষমতার কারণে বড় হন না; বরং তাঁদের ব্যক্তিত্বের ভারেই ক্ষমতা অর্থবহ হয়ে ওঠে।

আজ তাঁর প্রস্থান একটি যুগের সমাপ্তি নির্দেশ করে। কিন্তু জীবন সব সময় মৃত্যুতে শেষ হয় না—কিছু জীবন রয়ে যায় চিন্তায়, স্মৃতিতে ও ইতিহাসের পাতায়। বেগম খালেদা জিয়ার এক জীবন তেমনই এক অবিনশ্বর অধ্যায়, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক চেতনায় দীর্ঘকাল অনুরণিত হবে।

মহান আল্লাহ তাআলা তাকে পরকালেও একইভাবে সম্মানিত করুন।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

সম্পাদকীয়

সম্পাদক ও প্রকাশক