মো আব্দুল শহীদ, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : ধর্মপাশায় একটি সরকারি বিলে বাৎসরিক রাজস্ব প্রায় ৬২ লাখ টাকা। সেই বিলে আধিপত্য বিস্তার, মাছ লুট আর দখলদারিত্বের লড়াই এবার গড়িয়েছে রাজনীতি আর ব্যক্তিগত কাদা ছোড়াছুড়িতে। লিখিত বক্তব্য পাঠ করার ‘অপরাধে’ সাবেক ছাত্রদল নেতা ও বর্তমান যুবদল কর্মী জহিরুল হক হীরাকে দেয়া হয়েছে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ ট্যাগ! জবাবে প্রতিপক্ষকে অতীতে আওয়ামী লীগ ও বিকল্পধারার সুবিধাভোগী হিসেবে অভিযুক্ত করে পাল্টা তোপ দেগেছেন এই যুবদল নেতা।
রবিবার ২৬ জুলাই বেলা ৩টায় সুনামগঞ্জ শহরের ‘দৈনিক সুনামকণ্ঠ’ পত্রিকা কার্যালয়ে জয়ধনা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের ব্যানারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় রাজনীতি ও জলমহাল দখলের এই চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক তথ্য উঠে আসে।
ঘটনার নেপথ্যে ধর্মপাশা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ‘ডুবাইল বিল’। স্থানীয় মৎস্যজীবীদের অভিযোগ, গত ২১ জুলাই উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোঃ নূরুল ইসলাম (বিএসসি) ও সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সালাউদ্দিন মাহতাবের নেতৃত্বে ২০-২৫ জনের একটি সশস্ত্র দল দুটি নৌযান নিয়ে বিলে অবৈধভাবে প্রবেশ করে। তারা পাহাদারদের মারধর, নৌকা ভাঙচুর ও মাছ লুটপাট চালায়।
এই ঘটনার প্রতিবাদে গত ২৪ জুলাই প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন বিলে ইজারাদার ও সমিতির সদস্য মালেক সিকদার। মালেক সিকদার নিরক্ষর হওয়ায় মানবিক কারণে তাঁর পক্ষে লিখিত বক্তব্যটি পড়ে দেন সাবেক ছাত্রদল নেতা জহিরুল হক হীরা। আর তাতেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষ।
পরদিনই ২৫ জুলাই হীরাকে ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর’ ও ‘বহিরাগত’ আখ্যা দিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন অভিযুক্ত বিএনপি নেতারা।
এর জবাবে আজকের সংবাদ সম্মেলনে জহিরুল হক হীরা বলেন, আমি ধর্মপাশার স্থায়ী বাসিন্দা এবং দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলাম। কিন্তু আজ যারা আমাকে ফ্যাসিস্ট বলছে, তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড দেখুন! কেউ আওয়ামী লীগ সভাপতির হাতে ফুলের তোড়া দিয়েছেন, কেউ বিকল্পধারা থেকে এসেছেন, আবার কেউ স্থানীয় নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর এজেন্ট ছিলেন। জলমহাল জবরদখল ও মাছ লুট ধামাচাপা দিতেই তারা আমাকে ফ্যাসিস্ট ট্যাগ দিয়ে মিথ্যাচার করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে কেবল জলমহাল দখলই নয়, উঠে এসেছে প্রকাশ্যে হুমকি ও অস্ত্র দেখিয়ে স্ট্যাম্প ছিনতাইয়ের মতো চাঞ্চল্যকর অভিযোগ।
ভুক্তভোগী হীরা জানান, গত ৮ জুন জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে সরকারি খাজনার রাজস্ব রশিদ নিয়ে ফেরার পথে আব্দুজ জহুর ব্রীজ এলাকায় একদল সন্ত্রাসী তাঁর পথরোধ করে। অস্ত্র দেখিয়ে ও মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে ১০০ টাকার ৩টি খালি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক তাঁর স্বাক্ষর নেয়া হয়, যা পরবর্তীতে বড় ধরনের কোনো জালিয়াতিতে ব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
অন্যদিকে, লাগাতার হুমকির মুখে সমিতির মূল অভিযোগকারী মালেক সিকদার দীর্ঘদিন ধরে ভিটেমাটি ছেড়ে সুনামগঞ্জ জেলা শহরে আত্মগোপনে আছেন। এর আগে বিচার চেয়ে তিনি সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার বরাবর লিখিত আবেদনও জানান। উল্লেখ্য, উক্ত জলমহালে চুরির ঘটনায় আগে থেকেই একটি মামলা (মামলা নং-০৩, তারিখ: ০৩/০১/২০২৫) বিচারাধীন রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সতর্ক করে বলা হয়, প্রভাবশালীদের এই বেপরোয়া দখলদারিত্ব আর বিশৃঙ্খলার কারণে সরকার যেমন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি প্রকৃত মৎস্যজীবীরা তাদের রুজি-রুটি হারিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অবিলম্বে এই সশস্ত্র চক্রের হাত থেকে ডুবাইল বিল রক্ষা, ছিনতাই হওয়া স্ট্যাম্প উদ্ধার এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার জন্য জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জোর দাবি জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সভাপতি কামাল মিয়া, সিনিয়র সহ-সভাপতি ইদ্রিস মিয়া, সাধারণ সম্পাদক উসমান মিয়াসহ অন্যান্য সাধারণ সদস্য ও মৎস্যজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।