শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:১৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কুমিল্লায় সাংবাদিক শুভ্র দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন ৫ সেপ্টেম্বরের লংমার্চ সফল করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ হবে : এটিএম মাসুম বিতর্কে যুক্তিই হোক শক্তি, গলার স্বর নয় : ড. সায়মা ফেরদৌস মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মাভাবিপ্রবি উপাচার্যের অভিনন্দন দিরাইয়ে ভুয়া বিজিবি সদস্য হোটেলের জিনিসপত্র চুরির অভিযোগে ১ খুলনায় স্কুল ছুটির পাঁচ ঘণ্টা পর বাথরুমে হাত-পা-মুখ বাঁধা ছাত্রী উদ্ধার সীমান্তে ৫৯ বিজিবির অভিযানে ১৯৬ বোতল মাদকদ্রব্য জব্দ বিশ্বম্ভরপুর থানার নতুন ওসি আহম্মদ উল্লাহ ভূইয়া কিরন মহাসিং নদীর বাঁধের নিকট থেকে মাটি-বালু উত্তোলন বন্ধ ও কৃষি জমি রক্ষায় পুলিশ সুপার বরাবরে অভিযোগ গফরগাঁয়ে কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা

হাওরপাড়ের বাতিঘর : আটগাঁও হাফিজ আলী হাইস্কুলের সাড়ে তিন দশকের আলোকোজ্জ্বল যাত্রা

প্রতিনিধির নাম।।
প্রকাশকাল : শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ১০:৩১ অপরাহ্ন

তৌফিকুর রহমান তাহের, বিশেষ প্রতিনিধি সুনামগঞ্জ :
সুনামগঞ্জ জেলার অন্যতম দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকা হিসেবে পরিচিত শাল্লা উপজেলা। চারদিকে বিস্তীর্ণ হাওর আর বর্ষায় দিগন্তজোড়া জলরাশি—এমন এক প্রতিকূল জনপদে আজ থেকে সাড়ে তিন দশক আগে রোপণ করা হয়েছিল শিক্ষার এক মহীরুহ। ১৯৯০ সালে ১নং আটগাঁও ইউনিয়নের আটগাঁও গ্রামে প্রতিষ্ঠিত ‘হাফিজ আলী হাইস্কুল’ আজ শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, বরং গোটা এলাকার মানুষের স্বপ্ন পূরণের এক অনন্য বাতিঘর।
১৯৯০ সালের আগের কথা। হাওরপাড়ের অবহেলিত এই জনপদে তখন শিক্ষার আলো পৌঁছানো ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। সেই সময়ে এলাকার কয়েকজন দূরদর্শী মানুষ—মো. নূরুল হক তালুকদার, মো. আব্দুল লতিফ, শীতেশ সমাজপতি, রাজ মোহন সরকার এবং চিত্ররঞ্জন সিংহ তীব্রভাবে অনুভব করেন যে, এলাকার সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য একটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এই মহতী উদ্যোগের সাথে শুরু থেকেই ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন বিদ্যালয়ের বর্তমান দপ্তরি মো. নূরুল আমিন মিয়া।
এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপে উদ্যোক্তারা দ্বারস্থ হন এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব জনাব আব্দুল আহাদ তালুকদারের কাছে। দূরদর্শী এই মানুষটি তাঁদের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে এক বাক্যে বলেছিলেন, তোমরা যদি স্কুল করো, তবে আমি জায়গা দেব।
ভূমিদাতা পাওয়ার পর শুরু হয় মূল কর্মযজ্ঞ। উদ্যোক্তারা ছুটে যান এলাকার সচেতন মানুষদের দ্বারে দ্বারে। আশেপাশের আটটি গ্রামের মানুষকে সাথে নিয়ে একের পর এক বৈঠকের মাধ্যমে গড়ে তোলা হয় এক অভূতপূর্ব সামাজিক সমন্বয়। অবশেষে ১৯৯০ সালে, শিক্ষানুরাগী হিরনময় চৌধুরীকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘হাফিজ আলী হাইস্কুল, আটগাঁও’। জমিদাতা আব্দুল আহাদ তালুকদার তাঁর পরম শ্রদ্ধেয় পিতাহাফিজ আলী তালুকদারের নামে স্কুলটির নামকরণ করেন।
নেতৃত্বের পরিবর্তন ও আধুনিক শিক্ষার বিকাশ
প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জনাব আব্দুল আহাদ তালুকদার নিজেই। পরবর্তীতে প্রথম প্রধান শিক্ষক হিরনময় চৌধুরী বিদায় নিলে, ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে হাল ধরেন আব্দুল আহাদ তালুকদারের আপন ভাগিনা আরিফ মোহাম্মদ দুলাল। এই তরুণ ও দক্ষ শিক্ষকের হাত ধরে বিদ্যালয়ে শুরু হয় ‘স্মার্ট শিক্ষাদান’। তাঁর অনন্য অনুপ্রেরণা ও দক্ষ পরিচালনায় শিক্ষার্থীরা যেমন পড়ালেখায় অগ্রসর হয়, তেমনই মার্জিত ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করে।
পরবর্তীতে আরিফ মোহাম্মদ দুলাল শাল্লা সদর শাহীদ আলী মডেল হাইস্কুলে চলে গেলে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রাজ মোহন সরকার। এরপর নতুন প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন প্রদ্যুৎ কুমার দাস, যিনি বর্তমান সময় পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিদ্যালয়টি পরিচালনা করে আসছেন। এছাড়া বিদ্যালয়ের দীর্ঘ পথচলায় বিভিন্ন মেয়াদে সভাপতির দায়িত্ব পালন করে স্কুলটিকে এগিয়ে নিয়েছেন হাফিজ আলী সাহেবের সুযোগ্য সন্তান জনাব আব্দুস শহীদ গুণীজনদের অবদান ও প্রস্থান
স্কুলটির প্রতিষ্ঠার পেছনে যাঁদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য, তাঁদের অনেকেই আজ আমাদের মাঝে নেই। প্রতিষ্ঠাতা জমিদাতা আব্দুল আহাদ তালুকদার এবং যাঁর নামে স্কুল, সেই হাফিজ আলী তালুকদার—পিতা ও পুত্র দুজনেই আজ পরলোকে। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আজও এই দুই মহৎ প্রাণের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করেন।
অন্যদিকে, যিনি ছাত্রজীবন থেকেই এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন—সেই নূরুল হক তালুকদার পরবর্তীতে শ্যামারচর দাখিল মাদরাসায় ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। কয়েক বছর পর সেখানেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। হাওরবাসী আজও তাঁদের এই ঋণ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।
এলাকাবাবীর ধারণা, যদি ১৯৯০ সালে এই হাফিজ আলী হাইস্কুলটি প্রতিষ্ঠিত না হতো, তবে এই বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চল আজ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত থাকতো এবং অবহেলার অন্ধকারেই নিমজ্জিত থাকত। আজ এই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি)সহ বিভিন্ন নামী-দামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডি পেরিয়ে সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ দায়িত্বে সুনামের সাথে কর্মরত আছেন। হাওরপাড়ের মানুষের মুখে মুখে আজ তাই হাফিজ আলী হাইস্কুলের জয়গান।

শত প্রতিকূলতার মাঝেও এই বিদ্যালয়টি যেভাবে অবহেলিত জনপদে আলোর মশাল জ্বেলে চলেছে, তা সত্যিই এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তবে আলো ছড়ানো এই বাতিঘরটি নিজেই এখন অন্ধকারে জরাজীর্ণ। সাড়ে তিন দশক পার হলেও বিদ্যালয়টিতে লাগেনি আধুনিকতার ছোঁয়া, মেলেনি কোনো বড় সরকারি অনুদান। জরাজীর্ণ একটি টিনশেড ঘরের নিচে চলছে শত শত শিক্ষার্থীর পাঠদান। নেই সুপেয় পানি কিংবা উন্নত হাইজিন বা স্যানিটেশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বাস দেয়া হলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি হয়নি। বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠটিকে বাঁচাতে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও আধুনিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে এখানে দ্রুত একটি বহুতল একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা জরুরি। আর এটাই এখন বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষসহ গোটা এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ক্যালেন্ডার

August 2026
M T W T F S S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728293031
Web Design By Khan IT Host