মো আব্দুল শহীদ, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ই-জিপি (e-GP) ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ ঠিকাদারদের আস্থা অক্ষুণ্ন রাখতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার প্রকৌশলী রজত কান্তি দাস। এলটিএম (LTM) পদ্ধতির একটি টেন্ডার মূল্যায়ন নিয়ে অংশগ্রহণকারী ঠিকাদারদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি ও ক্ষোভের সৃষ্টি হলে, কোনো প্রকার বিতর্কের সুযোগ না দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পুরো দরপত্র প্রক্রিয়াটিই বাতিল ঘোষণা করেছেন তিনি।
উপজেলা প্রকৌশলীর এমন দ্রুত ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর তা ধামাচাপা না দিয়ে টেন্ডার বাতিল করার এই পদক্ষেপ প্রশাসনের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি বজায় রাখতে বড় ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার লিটল বার্ড স্কুলের ওয়াকওয়ে নির্মাণ কাজের জন্য (টেন্ডার আইডি-১২৮৬৪৪১) প্রায় ১৩ লাখ টাকার একটি এলটিএম টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছিল। ই-জিপি নিয়মানুযায়ী জেলা পর্যায়ের ৯৩ জন ঠিকাদার অনলাইনে সফলভাবে দরপত্র জমা দেন। পরবর্তীতে স্বয়ংক্রিয় ও পদ্ধতিগত মূল্যায়নের চূড়ান্ত ধাপে কারিগরি ও দাপ্তরিক যাচাই-বাছাইয়ে ৫টি প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় টিকে থাকে এবং ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে মেসার্স করিম আলী এন্ড সন্স কাজটির জন্য নির্বাচিত হয়।
তবে এই বাছাই প্রক্রিয়ায় কারিগরি কারণে বিপুল সংখ্যক ঠিকাদার বাদ পড়ায় স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলে এক ধরনের অসন্তোষ ও ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। সাবেক কাউন্সিলর কামাল হোসেনসহ কয়েকজন ঠিকাদার এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানান। দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় অফিসে কর্মরত সহকারী প্রকৌশলী মাহবুব আলমকে জড়িয়েও কিছু গুঞ্জন ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়।
চলতি বছরের শুরুতে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া রজত কান্তি দাস বিষয়টি সাধারণ ঠিকাদারদের সেন্টিমেন্ট ও ই-জিপির স্বচ্ছতার জায়গা থেকে বিবেচনা করেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, সরকারের উন্নয়নমূলক কাজে কোনো ধরনের বিতর্কের ছায়া পড়তে দেওয়া হবে না।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২১ জুন তাঁর স্বাক্ষরিত একটি জরুরি দাপ্তরিক আদেশে (স্মারক নংঃ ৪৬.০২.৯০১৮.৯০০.১৪.০০১.২৬-৩৮৬/১(১০)) বিতর্কিত দরপত্র বিজ্ঞপ্তিটি সম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করা হয়। নোটিশে উল্লেখ করা হয়, অনিবার্য কারণবশত দরপত্রটি বাতিল করা হলো এবং দ্রুতই পুনরায় নতুন দরপত্র আহ্বান করা হবে।
উক্ত আদেশের অনুলিপি তাৎক্ষণিকভাবে সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা পরিষদ প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ (ইউএনও) সকল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে, যা তাঁর প্রশাসনিক সততা ও নিয়মতান্ত্রিকতার প্রমাণ দেয়।
টেন্ডার বাতিলের এই সাহসী ও দ্রুত সিদ্ধান্তের পর বিশ্বম্ভরপুরের ঠিকাদার সমাজের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক তরুণ ঠিকাদার বলেন, অনেক সময় সরকারি কর্মকর্তারা অভিযোগ কানেই নেন না বা প্রভাবশালীদের চাপে কাজ পাইয়ে দেন। কিন্তু বর্তমান উপজেলা প্রকৌশলী রজত কান্তি দাস আমাদের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ৯৩ জন ঠিকাদারের সেন্টিমেন্টকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি যেভাবে দ্রুত রি-টেন্ডারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এতে ই-জিপি এবং এলজিইডি প্রশাসনের প্রতি আমাদের আস্থা আরও বাড়ল।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনোয়ার হোসেনও ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানান, যেকোনো কাজে স্বচ্ছতাই শেষ কথা। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা প্রকৌশলী উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে এবং সবার সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা পেশাদারিত্বের পরিচয় বহন করে।
উন্নয়ন কাজ যেন নিয়মতান্ত্রিক ও দুর্নীতিমুক্ত উপায়ে সম্পন্ন হয়, সেই লক্ষ্যে বিশ্বম্ভরপুর এলজিইডি আগামীতেও সাধারণ ঠিকাদারদের পাশে রেখে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কাজ করে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।