শিরোনাম :
আমরা চাদাঁবাজ ও মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করতে চাই! চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে ৫৩ বিজিবির অভিযান ১৪টি ভারতীয় গরু ও ৩৫ বোতল মদ জব্দ টোল ফ্রি করার দাবিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ‘সড়ক ভবন ঘেরাও’ হজ্বের টাকা আত্মসাৎ মামলায় জামিনে বেরিয়ে এসে বাদীর নামে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর প্রতিবাদ  ডিআইজির হাত থেকে সুনামগঞ্জে শ্রেষ্ঠ ওসির পুরস্কার পেলেন সদর থানার ওসি রতন শেখ নাফনদীতে মাছ শিকারের সময় ৪ জেলেকে আটক করেছে আরাকান আর্মি চিকিৎসকদের নিরাপত্তার দাবিতে পঞ্চগড়ে মানববন্ধন পঞ্চগড়ে এই প্রথম ৪০ মণ ওজনের ষাঁড়ের সন্ধান, বিক্রি হবে কোরবানি ঈদে শাল্লায় শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হলেন চারজন যাদুকাটা নদীতে নির্মাণাধীন সেতুর ৫ টি গার্ডার ভেঙে পড়েছে
মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ০৩:০৯ অপরাহ্ন

টিনের বাস, অচল জীবন: জবাব দেবে কে?

Reporter Name
Update : শনিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০১৮

একদিকে দেশ ভরে যাচ্ছে প্রাপ্তির সার্টিফিকেটে আর অন্যদিকে সাধারণেরা উন্নয়নের সোনার চামচে দুবেলা গিলছে চিরতার রস। প্রতিদিন নতুন নতুন পুরস্কার যোগ হচ্ছে শোকেসে। সেই সঙ্গে চলছে উদ্‌যাপন। সড়ক বন্ধ করে চলে উদ্‌যাপন, সাধারণেরা কাজের পথে আটকে গিয়ে চৌধুরীবাড়ির রাস উৎসবের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উদ্‌যাপন দেখে। কিছু করার নেই যে! রাস্তা বন্ধ থাকলে গণপরিবহন বন্ধ, গণপরিবহন বন্ধ হলে ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকানাবিহীনদের অফিস তো আর বন্ধ হয় না। যার কিছু নেই, তার পা আছে। কিন্তু ‘পা’-এর ভরসায় পথে নামলেই আবার পা ভরসা রাখে না। পড়ে যায় গর্তে, উন্নয়নের বড় বড় গর্তে। জীবনযুদ্ধের আরেক নাম রাজধানীর সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা।

হিসাবটা কেউ কি দেবে?
যুদ্ধ তবু থামার নয়। এই যুদ্ধের নাম জীবনযুদ্ধ। শনি-রবি থেকে বৃহস্পতিবার রাস্তার দিকে তাকালেই চোখে পড়ে এই যুদ্ধ। একটা বাসে ওঠার জন্য যুদ্ধ, একটা সিটের জন্য যুদ্ধ, ৫ টাকা ভাংতির জন্য যুদ্ধ, বাস থেকে নামার জন্য যুদ্ধ, রাস্তা পারাপারের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে জিতলে ঠিক সময়ে পৌঁছে যাওয়া যায় পরীক্ষার হলে, পাওয়া যায় এ প্লাস-গোল্ডেন। আর হেরে গেলে দুই হাজার টাকায় সরকারি চাকরির ফরম তুলে চট্টগ্রাম বা রাজশাহী থেকে পরীক্ষা দিতে আসা বেকার যুবককে এক ঘণ্টা দেরিতে আসায় ছলছল চোখে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় পরীক্ষার হলের গেটে। চাকরিটা এবারও হলো না! এই যুদ্ধে জিতে গেলে বসের গুডবুকে উঠে যায় নাম, বছর শেষে কয়টা টাকা বেশি বেতন বাড়লে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে কিছুটা তাল মেলানো যায়। হেরে গেলে সংসার-সন্তান, পরিবার নিয়ে পথে দাঁড়াতে হয়। এই যুদ্ধ তাই গুরুত্বপূর্ণ, একে এড়ানো যায় না। যুদ্ধ করতে তাই আলমারিতে ঠেসে ঠেসে কাপড় ঢোকানোর মতো ঢুকে পড়তে হয় বাসের ভেতর। মাথার ওপর লম্বা রড শক্ত করে ধরে ঝুলতে ঝুলতে, সকালে ইস্তিরি করে পরে আসা জামাটা ঘামে ভিজে হলদে হয়ে যায়। গাড়ি চললে তবু কিছুটা রেহাই, মাথার ওপর নষ্ট ফ্যান নিয়ে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য দাঁড়িয়ে থাকার কষ্ট কাউকে বোঝানো যায় না। এত যানজট, রাস্তায় এত এত গাড়ি, তবু বাদুড়-ঝোলাই নিয়তি! বিশ্বব্যাংকের তথ্য, যানজটের কারণে রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। আর যানজটের কারণে বছরে যে আর্থিক ক্ষতি হয়, অঙ্কের হিসাবে তা প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। ব্যক্তিগতভাবে একজন যাত্রীর জীবনের ক্ষতি, আয়ের ক্ষতি, আয়ুর ক্ষতির হিসাবটা কেউ কি দেবে?

নারীর জন্য বিশেষ পুরস্কার!
এ তো গেল সর্বজনীন ভোগান্তি। যাত্রীটি নারী হলে ভোগান্তির চিত্র অনেকখানি বদলে যায়। ‘ভিক্ষা হবে না’ বলে বড়লোকের বাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তেমনি ‘সিট নাই’ বলে বাসের দরজা বন্ধ হয়—নারী যাত্রীটি হয়তো তখন গাড়ির পাশে পাশে দৌড়াচ্ছে। যেন নারীদের অফিসে যাওয়ার তাড়া থাকতে পারে না, যেন নারী রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, কিন্তু বাসে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না! আবার কোনোমতে একবার বাসে উঠে গেলে এবং সিট না পেলে সোনায় সোহাগা। চালকের সহযোগী ভিড় ঠেলে ভাড়া তোলার সময় সচেতনভাবেই ছুঁয়ে যায় নারী শরীর। কম যান না কোনো কোনো সহযাত্রীও। ব্রেক থেকে ব্রেক শুধু একটু সুযোগের অপেক্ষা। একটা ব্রেক কষলেই গা ছেড়ে দেবে সহযাত্রী নারীটির গায়ের ওপর, বুঝুক নারী হয়ে পুরুষের মতো ঝুলে ঝুলে অফিসে যাওয়ার মজা! বাসের ভেতরের নির্দিষ্ট স্বভাবের পুরুষ যাত্রীরা দৃষ্টিসীমার মধ্যে থাকা নারীকে হয়রানি করতে লেগে পড়েন প্রতিযোগিতায়। কখনো সিট ছেড়ে দেন নারীটির জন্য। হয়রানি এড়াতে কৃতজ্ঞচিত্তে সিটে বসে পড়লে শুরু হয় পরবর্তী পর্বের হয়রানি। কাঁধের কাছে পুরুষ তাঁর শরীরের নিম্নাংশ ছুঁইয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, ভয়ে-লজ্জায় কুঁকড়ে যান সহযাত্রী নারী। মুখ খোলা যাবে না, কিছুক্ষণ আগেই যে তাঁরই সিটে তিনি বসে পড়েছেন! পুরুষ যাত্রীটি নারীর এই অস্বস্তি টের পান আর মহাভারতের দুর্যোধনের মতো মনে মনে বলে ওঠেনম ‘বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সূচ্যগ্র মেদিনী!’

প্রতিদিন খবর আসে
অফিসের পিক টাইমে পিঁপড়ার সারির মতো যানবাহন একটু নড়তে নড়তে যখন যাত্রীকে গন্তব্যে নামিয়ে দেওয়ার কথা, তখন পেছনের গাড়িগুলোর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। তারপর খবর আর গল্প লেখা হয়, রাজীব অথবা রোজিনা কিংবা হৃদয় শেখের নামে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ১ হাজার ৭৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৮৪১ জনের প্রাণহানি ও ৫ হাজার ৪৭৭ জন আহত হয়েছে। পঙ্গু হয়েছে ২৮৮ জন। এসব কম দামি জীবন ও দুর্ঘটনা বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেছেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনার জন্য সড়ক ব্যবস্থাপনা নয়, দায়ী হচ্ছে পরিবহন ব্যবস্থাপনা।’ আবার একই সরকারের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘সড়কের বেহাল দশার কারণে অনবরত দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে।’ জিজ্ঞাসা করলে শোনা যায়, ‘কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়!’

শাস্তির নাম ‘জনসেবা’
রাজধানীর উন্নয়নে সাতটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যুক্ত অন্তত ৫৬টি সেবা সংস্থা। ৫৬ রকম সেবা কতটা পাই, ৫৬ রকম ভোগান্তির আর বাকি নেই। কেউ খুঁড়ছে, তো কেউ বোজাচ্ছে, কেউ কাটছে, কেউ আটকাচ্ছে, কেউ উদাসীন। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) জরিপ অনুযায়ী, বিশ্বে বসবাসের অযোগ্য শহরের ১৪০টি শহরের মধ্যে রাজধানী ঢাকার অবস্থান ১৩৭ তম। আর এর বড় কারণ, রাজধানীর বেহাল রাস্তাঘাট। নিউইয়র্কের গবেষণা সংস্থা মারসার কনসালটিং গ্রুপের জরিপ প্রতিবেদনে বলেছে, বিশ্বের ২২৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ২০৮তম স্থানে। নিকৃষ্ট শহরের মধ্যে এশিয়ায় ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। আর এই বসবাসের অযোগ্য শহরে প্রতিদিন যোগ হচ্ছে টাকা, স্বপ্ন, ক্যারিয়ার ধরতে আসা নতুন মাথা। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে গত বছর ঢাকায় প্রতিদিন যুক্ত হওয়া এই নতুন মাথার সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ৭০০।

বন্ধ দরজাটা খুলবে না?
খবর আসছে, মেট্রোরেল নামের জনগণের নিত্যকার ভোগান্তির সূতিকাগার এই দুঃস্বপ্ন নির্মাণ সম্পন্ন হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। রাস্তায় কোনো যানজট থাকবে না, ধুলোবালু থাকবে না, গণপরিবহনের সংকট থাকবে না, সময়ের অপচয় থাকবে না, গাদাগাদি-ভিড় থাকবে না। কিন্তু প্রতিদিন যে হারে নতুন মুখের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলে। মাথাপিছু ডলারের পরিমাণ বাড়তে বাড়তে আকাশ ছোঁবে আর যারা এই উন্নয়নের ঘানি টানে, তাদের ঘাড়ের জোয়াল আরও ভারী হবে। রাস্তায় লম্বা হবে স্বপ্ন ধরতে আসা অন্ধ মানুষের ভিড়, মৃতের মিছিল।

বন্ধ দরজার সামনে অন্ধ ভরসা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত মানুষগুলো। তাদের জীবনেও একটা জাদুর দরজা খুলে যাক তবু। উন্নয়ন কেবল উন্নতদের গৃহবন্দী হয়ে না থেকে ছড়িয়ে পড়ুক এই শহরের কানাগলি, ঘুপচি রাস্তা আর ২৫-৩০ কিলোমিটার যানজটের মহাসড়কেও!


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ক্যালেন্ডার

May 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930