ঢাকা ০৫:৩৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বোদায় অবৈধ সার মজুদ করে অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে ব্যবসায়ীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা পঞ্চগড়ের নগরকুমারী হাটে অতিরিক্ত হাসিল আদায় : ইজারাদারকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা পঞ্চগড়ে কমিউনিটি পুলিশ কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপ-২০২৬ এর উদ্বোধন কুমিল্লায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা জোরদারের নির্দেশ কুমিল্লায় বোন-ভাতিজা হত্যার মূল আসামি গ্রেপ্তার চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পৌরসভার বিশেষ অভিযান আমতলীতে খাঁচায় আটক ৭ পাখি উদ্ধার, বনে অবমুক্তকরণ বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের ময়মনসিংহ বিভাগীয় সাংগঠনিক উন্নয়ন সভা অনুষ্ঠিত চরফ্যাশনে মডেল মসজিদের ছাদ থেকে পড়ে মাদ্রাসাছাত্রের মৃত্যু চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৮ মাসে ৭০ আত্মহত্যা, পরিবার-সমাজকে সচেতন হওয়ার আহ্বান পুলিশের

প্লাস্টিকের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশের তৈরি পণ্য

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:১১:২৪ পূর্বাহ্ণ, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক ইনসাফ নিউজ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : একসময় সাতক্ষীরার গ্রামীণ জীবনে বাঁশ-বেতের তৈরি হাতপাখা, কুলা, ডালি, ঝুড়ি, চালুনি কিংবা মাছ ধরার সরঞ্জাম ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। ঘর-গৃহস্থালি থেকে কৃষিকাজ, এমনকি মাছ ধরার কাজেও এসব পণ্যের ছিল ব্যাপক ব্যবহার। সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের চাহিদাও। সস্তা ও সহজলভ্য প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে সেই জায়গা এখন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্প এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কারিগরদের জীবন-জীবিকা।

সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কোরাপাক্রাতলা গ্রামের সড়কের পাশে বসে বাঁশের চিকন শলা দিয়ে ঝুড়ি তৈরি করছিলেন ৬৫ বছরের বেশি বয়সী বিশ্বনাথ দাস। অভিজ্ঞ হাতে একের পর এক বাঁশের ফালি বুনে তৈরি করছেন ঝুড়ি।

বিশ্বনাথ দাস বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেইক্যা এই কাম কইরা আসতেছি। এইডাই আমাগের ব্যবসা।’ তিনি আরও বলেন, একটা ঝুড়ি তৈরি করে ১৫০ টাকায় বিক্রি করি। এতে বাঁশ ও অন্যান্য খরচ পড়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ টাকা। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কাজ করে সর্বোচ্চ দুটি ঝুড়ি তৈরি করা যায়। আয় কম হলেও সংসারের কথা ভেবে পেশাটি ধরে রেখেছি। কাজ না করলে সংসার চলবে না। তাই কষ্ট হলেও করে যাচ্ছি।

দেবহাটা এলাকার আরেক কারিগর পঞ্চরঞ্জন দাসের জীবনেও একই গল্প। প্রায় ৭০ বছর ধরে তাদের পরিবার বাঁশের এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখলেও এখন আর এতে আগের মতো লাভ নেই। কোনোরকমে সংসার চালিয়ে নিতে হচ্ছে তাকে।

পঞ্চরঞ্জন দাস বলেন, আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকে এই কাজ করে আসছি। প্রায় ৭০ বছর হবে। এখন আর আমাদের এই কাজের তেমন একটা লাভ নেই। কোনো রকমে সংসার চলে। মাঝে মাঝে ঋণী হয়ে আবার কাজ করি। এভাবেই আমাদের জীবনযাপন।

তিনি জানান, বাঁশের কাজের সামান্য আয় দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থের অভাবে এক ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি বলে জানান তিনি।

পঞ্চরঞ্জন বলেন, ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা করাব কীভাবে? একটা ছেলে পড়াশোনা করতে চেয়েছিল, টাকার কারণে পড়াতে পারিনি। সেই ছেলে এখন কাজকাম করে।

তার এই কথাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাঁশের শিল্পে সংকট শুধু একটি পেশার সংকট নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, সন্তানের শিক্ষা এবং পরবর্তী প্রজন্মের জীবন।

কোরাপাক্রাতলা গ্রামের কারিগর অরবিন্দ দাস তৈরি করেন কাঁকড়া ধরার আটন, ঢাকনা, চিংড়ি ধরার খোলুই, মাটির ঝুড়ি, কাবড়া ও কুলাসহ বিভিন্ন পণ্য। তার ভাষ্য, গ্রামে প্রায় ৫০ জন মানুষ বাঁশের কাজের সঙ্গে যুক্ত।

তবে কাজ থাকলেও আগের মতো বাজার নেই। প্লাস্টিকের তৈরি ঝুড়ি, কুলা, ডালি ও অন্যান্য সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় বাঁশের পণ্যের চাহিদা কমেছে। একই সময়ে বেড়েছে বাঁশ ও উৎপাদন খরচ।

কারিগর স্বপন দাস জানান, বর্তমানে একটি বাঁশ কিনতেই ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। কিন্তু তৈরি পণ্যের দাম সেই অনুপাতে বাড়ছে না। তার দাবি, স্বল্প সুদে বা সুদমুক্ত ঋণ এবং সরকারি সহায়তা পেলে এই পেশার মানুষগুলো টিকে থাকতে পারবেন।

দেবহাটা উপজেলা পরিষদের সামনের সড়কে ভ্যানে করে বাঁশের পণ্য বিক্রি করেন ৬০ বছরের বেশি বয়সী রবিন দাস। প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তার ভ্যানে থাকে টাবরা, কুলা, ডালি, টোকা, ধামা-পালিসহ বিভিন্ন পণ্য।

রবিন দাস বলেন, একটা টাবরা ১৮০ টাকায় কিনে ২০০ টাকায় বেচি। এই ব্যবসা দিয়েই সংসার চালাই।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুর বাজারে বাঁশের পণ্য বিক্রি করেন কানাই কুমার। তিনি বলেন, ব্যবসা শুরুর সময় প্লাস্টিকের ব্যবহার এতটা ছিল না। গত পাঁচ বছরে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাঁশের পণ্যের বাজার অনেকটাই কমেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

প্লাস্টিকের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে বাঁশের তৈরি পণ্য

আপডেট সময় : ১২:১১:২৪ পূর্বাহ্ণ, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : একসময় সাতক্ষীরার গ্রামীণ জীবনে বাঁশ-বেতের তৈরি হাতপাখা, কুলা, ডালি, ঝুড়ি, চালুনি কিংবা মাছ ধরার সরঞ্জাম ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। ঘর-গৃহস্থালি থেকে কৃষিকাজ, এমনকি মাছ ধরার কাজেও এসব পণ্যের ছিল ব্যাপক ব্যবহার। সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের চাহিদাও। সস্তা ও সহজলভ্য প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে সেই জায়গা এখন ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। সঙ্গে হারিয়ে যেতে বসেছে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্প এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কারিগরদের জীবন-জীবিকা।

সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার কোরাপাক্রাতলা গ্রামের সড়কের পাশে বসে বাঁশের চিকন শলা দিয়ে ঝুড়ি তৈরি করছিলেন ৬৫ বছরের বেশি বয়সী বিশ্বনাথ দাস। অভিজ্ঞ হাতে একের পর এক বাঁশের ফালি বুনে তৈরি করছেন ঝুড়ি।

বিশ্বনাথ দাস বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেইক্যা এই কাম কইরা আসতেছি। এইডাই আমাগের ব্যবসা।’ তিনি আরও বলেন, একটা ঝুড়ি তৈরি করে ১৫০ টাকায় বিক্রি করি। এতে বাঁশ ও অন্যান্য খরচ পড়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ টাকা। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কাজ করে সর্বোচ্চ দুটি ঝুড়ি তৈরি করা যায়। আয় কম হলেও সংসারের কথা ভেবে পেশাটি ধরে রেখেছি। কাজ না করলে সংসার চলবে না। তাই কষ্ট হলেও করে যাচ্ছি।

দেবহাটা এলাকার আরেক কারিগর পঞ্চরঞ্জন দাসের জীবনেও একই গল্প। প্রায় ৭০ বছর ধরে তাদের পরিবার বাঁশের এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখলেও এখন আর এতে আগের মতো লাভ নেই। কোনোরকমে সংসার চালিয়ে নিতে হচ্ছে তাকে।

পঞ্চরঞ্জন দাস বলেন, আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকে এই কাজ করে আসছি। প্রায় ৭০ বছর হবে। এখন আর আমাদের এই কাজের তেমন একটা লাভ নেই। কোনো রকমে সংসার চলে। মাঝে মাঝে ঋণী হয়ে আবার কাজ করি। এভাবেই আমাদের জীবনযাপন।

তিনি জানান, বাঁশের কাজের সামান্য আয় দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। অর্থের অভাবে এক ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি বলে জানান তিনি।

পঞ্চরঞ্জন বলেন, ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা করাব কীভাবে? একটা ছেলে পড়াশোনা করতে চেয়েছিল, টাকার কারণে পড়াতে পারিনি। সেই ছেলে এখন কাজকাম করে।

তার এই কথাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাঁশের শিল্পে সংকট শুধু একটি পেশার সংকট নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, সন্তানের শিক্ষা এবং পরবর্তী প্রজন্মের জীবন।

কোরাপাক্রাতলা গ্রামের কারিগর অরবিন্দ দাস তৈরি করেন কাঁকড়া ধরার আটন, ঢাকনা, চিংড়ি ধরার খোলুই, মাটির ঝুড়ি, কাবড়া ও কুলাসহ বিভিন্ন পণ্য। তার ভাষ্য, গ্রামে প্রায় ৫০ জন মানুষ বাঁশের কাজের সঙ্গে যুক্ত।

তবে কাজ থাকলেও আগের মতো বাজার নেই। প্লাস্টিকের তৈরি ঝুড়ি, কুলা, ডালি ও অন্যান্য সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় বাঁশের পণ্যের চাহিদা কমেছে। একই সময়ে বেড়েছে বাঁশ ও উৎপাদন খরচ।

কারিগর স্বপন দাস জানান, বর্তমানে একটি বাঁশ কিনতেই ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। কিন্তু তৈরি পণ্যের দাম সেই অনুপাতে বাড়ছে না। তার দাবি, স্বল্প সুদে বা সুদমুক্ত ঋণ এবং সরকারি সহায়তা পেলে এই পেশার মানুষগুলো টিকে থাকতে পারবেন।

দেবহাটা উপজেলা পরিষদের সামনের সড়কে ভ্যানে করে বাঁশের পণ্য বিক্রি করেন ৬০ বছরের বেশি বয়সী রবিন দাস। প্রায় ২৫ বছর ধরে তিনি এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তার ভ্যানে থাকে টাবরা, কুলা, ডালি, টোকা, ধামা-পালিসহ বিভিন্ন পণ্য।

রবিন দাস বলেন, একটা টাবরা ১৮০ টাকায় কিনে ২০০ টাকায় বেচি। এই ব্যবসা দিয়েই সংসার চালাই।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ব্রহ্মরাজপুর বাজারে বাঁশের পণ্য বিক্রি করেন কানাই কুমার। তিনি বলেন, ব্যবসা শুরুর সময় প্লাস্টিকের ব্যবহার এতটা ছিল না। গত পাঁচ বছরে প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বাঁশের পণ্যের বাজার অনেকটাই কমেছে।