শিরোনাম :
ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে কাশিয়ানীতে অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার সাংবাদিক হাফিজুর রহমান শফিকের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে চট্টগ্রামে মানববন্ধন নাচোলে কৃষক বেশে আত্মগোপনে থাকা ২ বছরের সাজাপ্রাপ্ত মাদক মামলার আসামি গ্রেপ্তার পঞ্চগড়ে খেলার ছলে ডেকে নিয়ে দুই বছরের শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা মালয়েশিয়ান ব্যবসায়ি প্রতিনিধি দলের সাথে পঞ্চগড়ের ব্যবসায়ীদের মতবিনিময় আমরা ভারতের আন্দোলনরত ছাত্র তরুণদেরকে সাধুবাদ জানাই : নাহিদ ইসলাম ‎মোহাম্মাদিয়া হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এমপি মোস্তাফিজুর রহমান গফরগাঁওয়ে কমরেড আজিম উদ্দীন মাস্টার এর স্মরণসভা অনুষ্ঠিত পলাশবাড়ীতে বিদ্যালয়ের বারান্দায় জাতীয় পতাকা ফেলে রাখার অভিযোগ, তদন্তের আশ্বাস প্রশাসনের চরফ্যাশন পোস্ট অফিস সংস্কার কাজ বন্ধের ৩ বছরেও হয়নি নতুন ভবন নির্মাণ; জরাজীর্ণ ভবনে ঝুঁকি নিয়েই চলছে কার্যক্রম
রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৬ অপরাহ্ন

বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী তাজউদ্দীন আহমদের ১০১তম জন্ম বার্ষিকী

Reporter Name
Update : বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

ইনসাফ ডেস্ক :

বাল্যকাল ও ছাত্র জীবন

তাজউদ্দীন আহমদের জন্ম ২৩ জুলাই ১৯২৫ সালে, ঢাকা থেকে সড়ক পথে ৮২ কিলোমিটার দূরবর্তী কাপাসিয়া থানার দরদরিয়া গ্রামে। তাঁর বাবা মৌলভি মুহাম্মদ ইয়াসিন খান এবং মা মেহেরুন্নেসা খানম। তাঁরা ছিলেন চার ভাই ও ছয় বোন। রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের সন্তান হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদের শিক্ষাজীবন শুরু হয় তাঁর বাবার কাছে আরবি শিক্ষার মাধ্যমে। একই সময় তিনি ভর্তি হন বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরবর্তী ভুলেশ্বর প্রাইমারি স্কুলে। প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন প্রথম হয়ে। এ জন্য স্কুল থেকে জীবনে প্রথম ১০ পয়সার মূল্যমানের পুরস্কারও লাভ করেন- দেড় পয়সার কালির দোয়াত এবং সাড়ে আট পয়সার একটি কলম। চতুর্থ শ্রেণীতে উঠে তিনি ভর্তি হন দরদরিয়া থেকে পাঁচ মাইল দূরের কাপাসিয়া মাইনর ইংরেজি (এমই) স্কুলে। এই স্কুলে থাকার সময় তিনি তিনজন প্রবীণ বিপ্লবী নেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং তাঁরা ওই স্কুলের শিক্ষকদের কাছে এই ছাত্রকে আরও ভালো স্কুলে পাঠানোর সুপারিশ করেন। সেই সুবাদে তাঁকে কালীগঞ্জের সেন্ট নিকোলাস ইনস্টিটিউশনে ভর্তি করা হয়। এখানেও তাঁর মেধা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং এই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পরামর্শে তিনি ভর্তি হন ঢাকার মুসলিম বয়েজ হাইস্কুলে। তারপর সেন্ট গ্রেগরীজ হাইস্কুলে।

স্কুলে তাজউদ্দীন বরাবর প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। ষষ্ঠ শ্রেণীর এমই স্কলারশিপ পরীক্ষায় তিনি ঢাকা জেলায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৪৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে দ্বাদশ স্থানের অধিকারী হন। ১৯৪৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় তিনি ঢাকা বোর্ডে প্রথম বিভাগে চতুর্থ স্থান লাভ করেন। তাজউদ্দীন আহমদ পবিত্র কোরআনে হাফেজ ছিলেন, যা তিনি নিয়মিত লেখাপড়ার পাশাপাশি বাবার সান্নিধ্যে আয়ত্ত করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৪২ সালে তিনি সিভিল ডিফেন্স ট্রেনিং নেন এবং স্কুলের ছাত্র থাকা অবস্থায় কয়েক মাস নিয়মিত পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক এলাকায় রাতের বেলায় নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। এ কাজের জন্য তিনি প্রতি রাতের জন্য সম্মানী পেতেন ৮ আনা। তিনি আজীবন স্কাউট আন্দালনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

তাজউদ্দীন আহমদ স্কুলজীবন থেকে রাজনীতি তথা প্রগতিশীল আন্দোলন এবং সমাজসেবার সঙ্গে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। এ কারণেই তাঁর শিক্ষাজীবন মাঝেমধ্যেই ছেদ পড়েছে এবং নিয়মিত ছাত্র হিসেবে পরীক্ষা দেয়া তাঁর ভাগ্যে বড় একটা জোটেনি; তবুও রাজনীতি ও শিক্ষা তাঁর হাত ধরে চলেছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে ১৯৫৪ সালে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন। তবে ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে অংশ নেয়ার কারণে তাঁর এমএ পরীক্ষা দেয়া সম্ভব হয়নি। এ দিকে এমএলএ নির্বাচিত হয়েও তিনি আইন বিভাগের ছাত্র হিসেবে নিয়মিত ক্লাস করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে জেলে বন্দী থাকা অবস্থায় পরীক্ষা দিয়ে তিনি ১৯৬৪ সালে আইন শাস্ত্রেও স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পেশায় তিনি আইনজীবি ছিলেন।

সমাজ সেবক ও অসহায়ের বন্ধু :

বাংলা ১৩৫০ ( ইংরেজি ১৯৪৩ ) সনের দুর্ভিক্ষে অগণিত মানুষের খাদ্যাভাবে মৃত্যুবরণ তাজউদ্দীনের মনকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। দুর্ভিক্ষ-পরবর্তী সময়ে তিনি উপলব্ধি করেন, খাদ্যাভাবে আর যাতে কেউ মারা না যায়, তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এই চিন্তা থেকে তিনি গ্রামের লোকজনকে সংগঠিত করে স্থাপন করেন ‘ধর্মগোলা’, যা ছিল গ্রাম পর্যায়ে অশ্রুত এক প্রতিষ্ঠান। ফসল ওঠার মৌসুমে ধনী ব্যক্তিদের কাছ থেকে খাদ্যশস্য এনে ওই গোলায় জমা করা হতো, যাতে আপৎকালে ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেয়া সম্ভব হয়।

আর্তের সেবার তাঁর কোনো ক্লান্তি ছিল না। ১৯৫৪ সালে তিনি যখন এমএলএ, তখন তাঁর গ্রামের সাইফুদ্দীন দফাদারের ছেলে আবদুল আজিজ (১৫) বন্দুকের গুলিতে আহত হয়। তখন হাসান ও অন্যদের মাধ্যমে তাকে ঢাকায় তাজউদ্দীনের কাছে আনা হয়। তিনি অ্যাম্বুলেন্সে করে ওই বালককে হাসপাতালে নেন। তার জন্য তিনি নিজে ১০ আউন্স রক্ত দেন। পরে ওই বালকের মৃত্যুর সংবাদ শুনে তাজউদ্দীন আহমদ উদ্ভ্রান্তের মতো হাসপাতালে যান এবং পোস্টমর্টেমের ব্যবস্থা করেন। এই মৃত্যু তাঁকে গভীরভাবে মর্মাহত করেছিল।

তাজউদ্দীন আহমদ নিজ প্রচেষ্টা ও উদ্যোগে বিভিন্ন এলাকায় স্কুল প্রতিষ্ঠা ও সংস্কার করেন। সেখানে তিনি একাডেমিক শিক্ষা এবং এর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে শিক্ষক ও ছাত্রদের সঙ্গে আলোচনা করতেন।

 

পারিবারিক জীবন :

১৯৫৯ সালের এপ্রিল মাসের ২৬ তারিখে তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে সৈয়দা জোহরা খাতুন লিলির বিয়ে হয়। তাঁদের তিন মেয়ে, শারমিন আহমদ (রিপি), সিমিন হোসেন (রিমি), মাহজাবিন আহমদ( মিমি) এবং এক ছেলে, তানজিম আহমদ (সোহেল)।

উল্লেখ্য, সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন (বিয়ের পর তিনি এই নামেই পরিচিত হন) ছিলেন স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রথম নারী আহবায়িকা এবং এই দলের চরম দুর্দিনের কাণ্ডারি। ১৯৭৫ পরবর্তী সময় তিনি এই দলের হাল ধরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে পুনঃজীবিত করেন।

রাজনৈতিক জীবন :

ছাত্রজীবন থেকেই বাংলার মানুষের মুক্তির রাজনীতির সঙ্গে তাজউদীন আহমদের সম্পৃক্ততা ঘটে। ১৯৪৩ সাল থেকে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগেই এই পূর্ব অঞ্চলের মানুষের মুক্তির পথানুসন্ধান শুরু করেন। ১৯৪৪ সালে তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। কাউন্সিলর হিসেবে তিনি ১৯৪৫ ও ১৯৪৭ সালে দিল্লি কনভেনশনে যোগ দেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে দলীয় কর্মসূচি প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি সে সময় অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন অংশে প্রচারাভিযান চালান।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর থেকে ভাষার অধিকার, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী যত আন্দোলন হয়েছে, তাজউদ্দীন এর প্রতিটিতেই নিজ চিন্তা ও কর্মের সাক্ষর রাখেন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পাকিস্তান ছাত্রলীগ (বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ) গঠিত হয়। তিনি ছিলেন এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

তাজউদ্দীন আহমদ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন। ১৯৪৮ সাল থেকে ভাষার প্রশ্নে যে বিক্ষোভ ও প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে, তিনি ছিলেন তার সক্রিয় অংশী।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ গঠিত হয়। তাজউদ্দীন ছিলেন এর মূল উদ্যোক্তাদের অন্যতম। ১৯৫৩-৫৭ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে তরুণ তাজউদ্দীন সেই সময়ের পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ফকির আবদুল মান্নানকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে এমএলএ নির্বাচিত হন। নির্বাচনে তাজউদ্দীন আহমদ ১৯০৩৯ এবং ফকির আবদুল মান্নান ৫৯৭২ ভোট পান।

১৯৫৫ সালে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে তাজউদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। এ সময় তিনি যুক্তরাজ্যও সফর করেন। ১৯৬২ সালে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে তিনি সক্রিয় অংশ নেন এবং কারাবরণ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন।

 

তাজউদ্দীন আহমদের ডায়রি

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে তাজউদ্দীন আহমদের তরুন বয়সে লেখা ডায়রি গুলির গুরুত্ব ব্যাপক। তার লিপিবদ্ধ ১৯৪৭-১৯৫২ সালের ডায়রির উপর ভিত্তি করে গবেষক বদরুদ্দীন উমর প্রকাশ করেন, ”পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি” এবং “ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ কতিপয় দলিল।“ তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর নিখুঁত, পরিছন্ন ও মুক্তার মত হাতের লেখার মধ্যে দিয়ে তুলে ধরেছেন প্রতিদিনের আবহাওয়া, কৃষক-মজুরের অবস্থা, এতিমখানার অসহায় বালকদের দুর্দশার চিত্র, দীন হীন অতি সাধারণ ও অসাধারণ মানুষদের কথা।

 

ছয় দফা

এর পরের বছরগুলো তাজউদ্দীন আহমদ এবং আওয়ামী লীগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৬ সালে তিনি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধীদলীয় সম্মেলনে যোগ দেন। এই সম্মেলনেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা ঘোষণা করেন। উল্লেখ্য, ছয় দফার অন্যতম রূপকার ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ এবং তার অসামান্য মুখবন্ধটিও তিনি রচনা করেন। ছয় দফাকে অযৌক্তিক দাবি করে পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্ট যখন শেখ মুজিবকে তর্ক যুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করেন, তখন ছয় দফার পক্ষে তাজউদ্দীন আহমদের তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণের কাছে হার মেনে তর্ক যুদ্ধ শুরু হবার আগে সেই দিনই ভুট্ট তার উপদেষ্টার দল সহ চুপিসারে ঢাকা ত্যাগ করেন।

আপন সাংগঠনিক দক্ষতা, অসামান্য মেধা ও একনিষ্ঠতার গুণে ইতোমধ্যে তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হয়ে ওঠেন। এ বছরই তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। ছয় দফার প্রচারাভিযানের সময় ১৯৬৬ সালের ৮ মে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং গণ অভ্যুত্থানের ফলে ১৯৬৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মুক্তিলাভ করেন।

১৯৭০ সালের নির্বাচন ও অসহযোগ আন্দলন :

এরপর ১৯৭০ সালে তৎকালীন পাকিস্তানে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। তাজউদ্দীন আহমদ ওই নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

নির্বাচনের পর গণ রায় অস্বীকার করে বাঙালিদের অধিকার অর্জনের দাবি নস্যাতে নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু হয় এবং ১ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আকস্মিকভাবে স্থগিত ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে শুরু হয় অভূতপূর্ব অসহযোগ আন্দোলন। এই অসহযোগ আন্দোলনে সাংগঠনিক দিকগুলো পরিচালনা ও জনগণের কর্তৃত্বের পরিপ্রকাশক নির্দেশাবলি প্রণয়নে তাজউদ্দীন আহমদ অতুলনীয় সাংগঠনিক দক্ষতা প্রদর্শন করেন। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালেই পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের সঙ্গে ঢাকায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হয়। ১৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই আলোচনায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আস্থাভাজন সহযোগী হিসেবে তাজউদ্দীন আহমদ অতুলনীয় বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতার পরিচয় দেন।

মুক্তিযুদ্ধের সফল কাণ্ডারি :

২৪ মার্চ তৎকালীন পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সংকট নিরসনের জন্য চূড়ান্ত বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে বৈঠক আর অনুষ্ঠিত হয়নি। বরং ২৫ মার্চ সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান এবং তাঁর আলোচক ও সহযোগীরা কাউকে কিছু না জানিয়ে গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। ২৫ মার্চ মধ্যরাত থেকেই ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে শান্তিপ্রিয় জনগণের ওপর পরিচালনা করা হয় গণহত্যার পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি। ইয়াহিয়ার নির্দেশে সামরিক বাহিনী শুরু করে গণহত্যাযজ্ঞ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাজউদ্দীন আহমদকে বন্দী করতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী তাঁর বাড়ি আক্রমণ করে। কিন্তু তার সামান্য কিছুক্ষন আগেই মাতৃভূমিকে মুক্ত করবেন এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন। জোহরা তাজউদ্দীন উর্দু ভাষী ভাড়াটিয়া সেজে হানাদার বাহিনীর হাত থেকে কোনমতে বেঁচে নাবালিক সন্তানদের নিয়ে দেয়াল টপকে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নেন। ওদিকে পথের মধ্য পাওয়া একটি চিরকুটে তাজউদ্দীন তাঁর স্ত্রীকে লিখেন, “ লিলি আমি চলে গেলাম। যাবার সময় কিছুই বলে আসতে পারিনি। মাফ করে দিও। আবার কবে দেখা হবে জানিনা……মুক্তির পর। তুমি ছেলে মেয়ে নিয়ে সাড়ে সাত কোটি মানষের সাথে মিশে যেও।“ দোলন চাঁপা ( তাজউদ্দীন আহমদের ছদ্ম নাম)। দুর্গম যাত্রা পথের সঙ্গি ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের সাথে যেতে যেতে তাঁর মাথায় উদয় হয় এক ইতিহাসের মোড় পরিবর্তন কারী চিন্তার। তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার জীবননগরের কাছে সীমান্তবর্তী টুঙ্গি নামের এক স্থানে সেতুর নিচে ক্লান্ত দেহ এলিয়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষের মুক্তির জন্য তিনি একটি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার কথা চিন্তা করেন। দিনটি ছিল ৩০ মার্চ, ১৯৭১।

বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে নেতৃত্বে মূল দায়িত্ব অর্পিত হয় তাজউদ্দীন আহমদের ওপর। ১০ এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হলে তিনি সর্বসম্মতভাবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৭ এপ্রিল, মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথ তলার আম্র কাননে গনপ্রজাতন্ত্রী প্রথম বাংলাদেশ সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও ওই সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা, স্থানীয় জনগণ এবং শত শত দেশি-বিদেশি সাংবাদিক ও প্রচারমাধ্যমের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠনিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। তাজউদ্দীন আহমদ ঐ স্থানটির নতুন নামকরন করেন,”মুজিব নগর”- স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী। এরপর শুরু হয় বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক সশস্ত্র স্বাধীনতার যুদ্ধ। বাংলাদেশের ইতিহাসের ঐতিহাসিক এই সন্ধিক্ষণে তাজউদ্দীন আহমদের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। বাইরের আগ্রাসী হানাদার বাহিনী, এবং দলের ভেতরের সরকার ও স্বাধীনতা বিরোধী একাংশের ষড়যন্ত্র, তাঁকে হত্যার প্রচেষ্টা, এক কোটি শরণার্থীর ভরন পোষণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিংএর ব্যবস্থা সহ যেসব চরম প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল তার ভেতর দিয়ে অতি অল্প সময়ের মধ্যে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সামরিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, বিষয়াদিসহ সব দিক সংগঠিত করে তোলেন। তাঁর সফল নেতৃত্বে বাংলাদেশ মাত্র নয় মাসেই মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করে। মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর ত্যাগ, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও স্বদেশপ্রেম সবাইকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে। মুক্তিযুদ্ধে সফল নেতৃত্ব দান তাজউদ্দীন আহমদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় হিসেবে নির্দ্ধিধায় অভিহিত করা চলে।

প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক ধনুক ভাঙ্গা পণ করেছিলেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে যতদিন দেশ স্বাধীন না হবে তিনি পারিবারিক জীবন যাপন করবেন না। তিনি বলতেন যে রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধারা যদি পরিবার বিহীন অবস্থায় যুদ্ধ করতে পারে তাঁদের নেতা হয়ে তিনি কেন পারবেন না। তিনি অক্ষরে অক্ষরে সেই প্রতিজ্ঞা পালন করেছিলেন। তিনি কলকাতার তৎকালীন ৮ নম্বর থিয়েটার রোড, স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাজধানী ‘মুজিব নগরের’ অফিস কক্ষের পাশের একটি ছোট রুমে থাকতেন। সেখানে ছিল একটি ছোট চৌকি, যেখানে ঘুমাতেন মাত্র দুই-তিন ঘন্টা। নিজের পরনের একটি মাত্র শার্ট, নিজ হাতে কেঁচে তাই পরে তিনি রনাঙ্গনে, মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ও শরণার্থী শিবিরে যেতেন।

 

গনমানুষের অর্থমন্ত্রী :

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর তাজউদ্দীন আহমদ বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে যে নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়, সেই মন্ত্রিসভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। মন্ত্রী হিসেবে আত্মনির্ভর বিকাশমান অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য তিনি বিশেষ সচেষ্ট ছিলেন। কৃষক-শ্রমিক-মজুর ও গন মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন তাঁর পেশ করা তিনটি বাজেটকে এখনও বাংলাদেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বাজেট হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দানকারী এই মেধাবী, সৎ, দক্ষ ও দূরদর্শী নেতা স্বাধীন দেশের মন্ত্রীসভায় বেশিদিন কাজ করার সুযোগ পাননি। ১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর তিনি মন্ত্রিত্বের পদ থেকে সরে দাঁড়ান।

 

নির্মম হত্যাকাণ্ড :

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ক্ষমতা দখলকারী ঘাতকদের হাতে সপরিবারে নির্মমভাবে নিহত হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একই দিন সকালে তাজউদ্দীন আহমদকে গৃহবন্দী করা হয় এবং পরে ঢাকা কেন্দ্রীয় করাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। বন্দী অবস্থায় ৩ নভেম্বর ১৯৭৫, কারাগারের সব নিয়ম ভঙ্গ করে বর্বরতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটিয়ে ঘুম থেকে ডেকে তুলে নিঠুরভাবে হত্যা করা হয়।

তাজউদ্দীন আহমদ এবং বাংলাদেশের তিন জাতীয় নেতা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে।

যিনি ছিলেন এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের পুরোধা ব্যক্তিত্ব, যিনি আজীবন জনগণের কল্যাণ নিয়ে ভেবেছেন, যে মানুষটি বাঙালি জাতির জন্য সুখী, স্বাধীন জীবন গড়ার সংগ্রামে পরমভাবে নিবেদিত ছিলেন, সেই প্রচারবিমুখ, ত্যাগী ও কৃতী দেশপ্রেমিক মানুষটিকে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করল স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকের দল। এমনটি যে ঘটতে পারে সেই সতর্কবানী তিনি বহুবার উচ্চারন করেছিলেন। তার সব সতর্ক বানী ও সদুপদেশকে সেদিন গ্রাহ্য করা হলে এই মহাবিপর্যয় কে প্রতিহত করা যেত। দেশ ও জাতি এগিয়ে যেত বহু দূর।

কোন প্রকার কৃতিত্বর দাবী না করে তাজউদ্দীন আহমদ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাস্ট্রের সৃষ্টিতে যে অনন্য ও অসাধারণ নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই ইতিহাস আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে স্বাধীনতার অঙ্গীকার সাম্য, সুবিচার ও মানবিক মর্যাদার আলোকিত পথে।

সূত্র : সোহেল তাজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

ক্যালেন্ডার

July 2026
M T W T F S S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930