সেনবাগ উপজেলা প্রতিনিধি : সরকারি চিঠি দিয়েও দমানো গেল না ‘মেসার্স ফাইজ এন্টারপ্রাইজ’কে কুতুবেরহাট-চান্দরহাট-সেবারহাট (রোড কোড: ৪৭৫৮০২০০২) সড়কে প্রমাণসহ ফের অনিয়মের অভিযোগ ঠিকাদারের বিরুদ্ধে। ব্যাপক অনিয়ম ও দূর্নীতির মহোৎসবে চলছে নোয়াখালী সেনবাগ উপজেলার রাস্তা মেরামত উন্নয়ন কাজ!
দাপ্তরিক স্মারক নং-২৯০৯ এর নিষেধাজ্ঞা অমান্য এলজিইডি কর্তৃক কাজ বন্ধের পর ফের চালু হতেই চাটখিলের লাইসেন্সধারী ঠিকাদারের নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের ধুম, সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং উপজেলা প্রকৌশলীর লিখিত দাপ্তরিক আদেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সেনবাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংস্কার কাজে আবারও নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) কর্তৃক অনিয়মের প্রমাণ পেয়ে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার পর, পরিস্থিতি কিছুটা ঠাণ্ডা হতেই পুনরায় কাজ চালু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, কাজ চালু হতেই পূর্বের চেয়েও দ্বিগুণ উৎসাহে একই ধরনের নিম্নমানের ও ঠুনকো উপকরণ দিয়ে কাজ সারছে তারা। লাইসেন্সধারী ঠিকাদারের এমন প্রকাশ্য লুটপাটে স্থানীয় জনগণের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার অধীনে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের জিওবিএম (GOBM) প্রকল্পের আওতায় ‘কুতুবেরহাট-চান্দরহাট-সেবারহাট আরএইচডি রোড’ (রোড কোড: ৪৭৫৮০২০০২, চেইন: ৫৮০০-৮৯৪৮ মিটার) সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় ১৯ লাখ ২৩ thousand ৪০৫ টাকা (১৯,২৩,৪০৫ টাকা) প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই ওভার-লে (Over Lay) রক্ষণাবেক্ষণ কাজের চুক্তি পায় চাটখিলের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ফাইজ এন্টারপ্রাইজ।
প্রকল্পের শুরু থেকেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি চুক্তি অনুযায়ী কাজ না করে সম্পূর্ণ স্পেসিফিকেশন বহির্ভূত ও অত্যন্ত নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করতে থাকে। বিষয়টি নজরে এলে গত ১৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে সেনবাগ উপজেলা প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) সাবিনা সুলতানা সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে ঠিকাদারের জঘন্য অনিয়ম হাতেনাতে প্রমাণিত হওয়ায় তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কাজ বন্ধ করে দেন।
পরবর্তীতে একই দিনে স্মারক নং- ৪৬.০২.৭৫৮০.৬১১.১৪.০০১.২৬-২৯০৯ মূলে মেসার্স ফাইজ এন্টারপ্রাইজ-কে একটি অতিব জরুরি দাপ্তরিক চিঠি পাঠানো হয়। উক্ত চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয় যে, তদারকি কর্মকর্তার কোনো প্রকার অনুমতি ছাড়াই ঠিকাদার সাইটে নিম্নমানের ইট আনয়ন করেছেন এবং তা দিয়ে এজিং-এর কাজ শুরু করেছেন, যা সম্পূর্ণ চুক্তি পরিপন্থী। চিঠিতে অবিলম্বে সাইট থেকে ওইসব নিম্নমানের সামগ্রী অপসারণের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয় এবং অন্যথায় ঠিকাদারের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট সুপারিশ করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
সরকারি আদেশকে তোয়াক্কা না করে ফের অনিয়মের ধুম এলজিইডি’র ওই কড়া নোটিশ এবং কাজ বন্ধের নির্দেশের পর কিছুদিন প্রকল্পের কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় ঠিকাদার। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো প্রকার মালামাল অপসারণ না করেই এবং এলজিইডি’র ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সম্প্রতি মেসার্স ফাইজ এন্টারপ্রাইজ আবারও সড়কের কাজ শুরু করে।
সরেজমিনে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, প্রশাসনের দেয়া ‘লাল নোটিশ’ বা সতর্কবার্তাকে বিন্দুমাত্র কেয়ার করছেন না ঠিকাদার। বর্তমানে সড়কের যে অংশের কাজ চলছে, সেখানে ল্যাব টেস্টের তোয়াক্কা না করে আগের মতোই ৩ নম্বর ও ৪ নম্বর গ্রেডের ভাঙা ইট, বালুর পরিবর্তে মাটিযুক্ত রাবিশ এবং অত্যন্ত নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি রোলার দিয়ে প্রপার কমপ্যাকশন না করেই তড়িঘড়ি করে পিচ ঢালাইয়ের (ওভার-লে) প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে, যাতে করে তাদের ভেতরের সব অনিয়ম মাটির নিচে চাপা পড়ে যায়।
কুতুবেরহাট ও সেবারহাট এলাকার একাধিক বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই রাস্তাটি দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এবং যানবাহন চলাচল করে। একবার হাতেনাতে চুরি ধরার পর ইঞ্জিনিয়ার আপা কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। আমরা ভেবেছিলাম এবার হয়তো ঠিকাদার সোজা হবে এবং ভালো কাজ পাব। কিন্তু কাজ আবার চালু হতেই দেখি সেই আগের মতোই পচা মালামাল দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। সরকারি চিঠি বা আইনকে এরা পাত্তাই দেয় না। প্রশাসনের নাকের ডগায় কোটি টাকার এই প্রকল্পে এমন হরিলুট কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এই রাস্তা ছয় মাসও টিকবে না।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক সচেতন ব্যক্তি জানান, বারবার লিখিতভাবে সতর্ক করার পরও মেসার্স ফাইজ এন্টারপ্রাইজ একই অপরাধ করার সাহস পাচ্ছে কারণ তাদের পেছনে শক্তিশালী একটি মহল রয়েছে। সরকারি চুক্তি ভঙ্গ এবং দাপ্তরিক স্মারক নং-২৯০৯ এর নির্দেশ অমান্য করার পরও কেন এই ঠিকাদারি লাইসেন্সটি এখনো কালো তালিকাভুক্ত (Blacklisted) করা হচ্ছে না, তা নিয়ে এখন নানা মহলে প্রশ্ন উঠছে।
কুতুবেরহাট-চান্দরহাট-সেবারহাট সড়কের স্থায়িত্ব রক্ষা এবং সরকারের কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট সুনিশ্চিত করতে এলজিইডি’র নোয়াখালী জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সেনবাগের সর্বস্তরের জনগণ। তারা অবিলম্বে এই ত্রুটিপূর্ণ কাজ বন্ধ করে তদন্ত কমিটির মাধ্যমে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন।