ঢাকা ০৩:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
গোপালগঞ্জে জাতীয় যুব দিবসের অনুষ্ঠান শুরু  গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তঃবিভাগ ফুটবল প্রতিযোগিতা শুরু সাতক্ষীরা এইচএসসি পরীক্ষায় দুই কলেজে পাস করেনি কেউ সাতক্ষীরা ‎উপকূলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার প্রতি ৩ হাজার টাকা দাবি করার অভিযোগ তথ্য সংগ্রহকারী বর্ণা ও তার স্বামী বিদ্যুৎ সরকারের বিরুদ্ধে ‎তালায় নারীর প্রতি সহিংসতা ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সংলাপ সভা শাল্লায় দুই পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে টেঁটাবিদ্ধ হয়ে মন্নার মিয়ার মৃত্যু, আহত অন্তত ১৫ পাসের হার ৪৮.০৪ শতাংশ, শূন্য পাস ১৫ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন অভিযানে শ্রমিকদের সঙ্গে মাঠে সিটি প্রশাসক টিপু বাংলাদেশের রাজনীতিতে যুবদলের ভূমিকা দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে : পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

পরিবার প্রতি ৩ হাজার টাকা দাবি করার অভিযোগ তথ্য সংগ্রহকারী বর্ণা ও তার স্বামী বিদ্যুৎ সরকারের বিরুদ্ধে

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৪৫:২০ পূর্বাহ্ণ, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক ইনসাফ নিউজ অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মো আব্দুল শহীদ, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি : দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ফ্যামিলি কার্ড। অথচ এই কার্ড পাইয়ে দেয়ার কথা বলে সুনামগঞ্জের শাল্লায় পরিবারপ্রতি ৩ হাজার টাকা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে তথ্য সংগ্রহকারী বর্ণা রানী সরকার ও তার স্বামী হবিবপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি বিদ্যুৎ সরকারের বিরুদ্ধে। শুধু টাকা দাবিই নয়, টাকা দিতে রাজি না হলে দরিদ্র পরিবারের তথ্য সংগ্রহ না করার অভিযোগও করেছেন স্থানীয় উপকারভোগীরা। এ ঘটনায় বিদ্যুৎ সরকারের টাকা দাবির কথোপকথনের একটি ভিডিও এসেছে প্রতিবেদকের হাতে। অন্যদিকে, তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে বর্ণা রানী সরকারের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। চূড়ান্ত ও অপেক্ষমাণ তালিকায় নাম না থেকেও তিনি কীভাবে দায়িত্ব পেলেন, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

অভিযোগের পর বর্ণা রানী সরকারের তথ্য সংগ্রহের আইডি নিষ্ক্রিয় করেছে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়। তাঁকে শোকজ করা হয়েছে এবং এর অনুলিপি জেলা কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা। তবে নিয়োগের নেপথ্যের বিষয়টি এখনো পরিষ্কার হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শাল্লা উপজেলার চারটি ইউনিয়নে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য ৩৪ জনকে চূড়ান্তভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি অপেক্ষমাণ তালিকায় রাখা হয় আরও ১৬ জনকে। এর মধ্যে হবিবপুর ইউনিয়নে চূড়ান্ত হন আটজন। চাকুয়া গ্রামের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পাওয়ার কথা ছিল জুয়েল চন্দ্র দাসের।

কিন্তু সরেজমিনে ওই ওয়ার্ডে তথ্য সংগ্রহ করতে দেখা যায় বর্ণা রানী সরকারকে। এ বিষয়ে জুয়েল চন্দ্র দাসের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চূড়ান্ত তালিকায় তাঁর নাম থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নিয়োগ পাননি। অন্যদিকে, অপেক্ষমাণ ১৬ জনের তালিকাতেও বর্ণা রানী সরকারের নাম পাওয়া যায়নি।

তাহলে প্রশ্ন উঠছে, নির্ধারিত তালিকায় নাম না থাকার পরও কীভাবে তিনি তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পেলেন? কার সুপারিশে বা কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে তাঁকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল? চূড়ান্ত তালিকায় থাকা জুয়েল চন্দ্র দাস কেন দায়িত্ব পেলেন না? এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

ফ্যামিলি কার্ডের জন্য পরিবারপ্রতি ৩ হাজার টাকা দাবির অভিযোগের পক্ষে প্রতিবেদকের হাতে একটি ভিডিও এসেছে। ভিডিওতে বিদ্যুৎ সরকারকে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য উপকারভোগীকে ৩ হাজার টাকা দিতে হবে বলে বলতে শোনা যায়। এ সময় এক উপকারভোগী কিছু টাকা কম নেওয়ার জন্য তাঁকে অনুরোধ করেন।

চাকুয়া গ্রামের কয়েকজন উপকারভোগীর অভিযোগ, বর্ণা রানী সরকার মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করলেও পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁর স্বামী বিদ্যুৎ সরকার। তাঁদের দাবি, কোনো পরিবার টাকা দিতে সম্মত হলে সেই পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আর টাকা দিতে রাজি না হলে তথ্য নেওয়া হয় না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী উপকারভোগী বলেন, বিদ্যুৎ সরকার আমাকে বলেছেন, ফ্যামিলি কার্ড পেতে হলে ৩ হাজার টাকা লাগবে। শুধু আমাকে নয়, আশপাশের সব মহিলার কাছেই টাকার কথা বলেছেন। আমি গরিব মানুষ, পরের বাড়িতে কাজ করে খাই। তাঁকে ২ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তিনি রাজি হননি।

টাকা দাবির অভিযোগ এবং দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ সরকার বলেন, স্লিপ অব ট্যাং হয়ে গেছে, এর জন্য আমি দুঃখিত। আর কখনো এমন হবে না। তারা কখনো কিছু পায় নাই বলছে, তাই আমি তাদের উপকারের জন্য বলছি। আমি এই ওয়ার্ডের বিএনপির সভাপতি, আমাকে শাল্লা উপজেলা সহ এমপি সাহেব আমাকে চিনে।

তিনি আরও বলেন, আমরা যেহেতু পার্টি করি, তাই আমার স্ত্রীর চাকরিটা হয়েছে। আওয়ামী লীগ থাকলে তো হতো না।

তাঁর এই বক্তব্য নতুন করে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্ন সামনে এনেছে। দলীয় পরিচয়ের কারণে তাঁর স্ত্রীর নিয়োগ হয়েছে কি না, তা নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে। তবে এ বিষয়ে বিদ্যুৎ সরকারের বক্তব্যের বাইরে কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহকারী বর্ণা রানী সরকারের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোন ওয়ার্ডে তথ্য সংগ্রহ করছেন, সেই ওয়ার্ডের নামও বলতে পারেননি। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

একজন দলীয় নেতার বিরুদ্ধে সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির নামে টাকা দাবির অভিযোগ ওঠায় বিএনপির ভাবমূর্তি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে শাল্লা উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল আওয়াল বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচির আওতায় ফ্যামিলি কার্ড। যদি কোনো ব্যক্তি বা দলের লোক এই ফ্যামিলি কার্ড বিতরণে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তবে অভিযোগ ওঠার পর বিদ্যুৎ সরকারের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা এখনো জানা যায়নি। অভিযোগের সত্যতা দলীয় তদন্তে প্রমাণিত হলে তাঁকে ওয়ার্ড সভাপতির পদ থেকে অব্যাহতি বা বহিষ্কারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

শাল্লা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা বিশ্বপতি চক্রবর্তী বলেন, বিষয়টি আমরা জানতে পেরে সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর আইডি ডিঅ্যাক্টিভ করেছি। বর্ণা রানী সরকার আর কোনো তথ্য নিতে পারবেন না। উপজেলায় এ বিষয়ে মিটিং করে বর্ণা রানী সরকারকে শোকজ করেছি। শোকজের অনুলিপি জেলায় পাঠিয়েছি।

অন্যদিকে, শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহের জন্য স্বেচ্ছাসেবী নির্বাচন কমিটির সভাপতি প্রিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি। সমাজসেবা কর্মকর্তার সঙ্গে বসে যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

দুই কর্মকর্তার বক্তব্যে প্রশাসনিক পদক্ষেপের অবস্থান নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা দেখা দিয়েছে। সমাজসেবা কর্মকর্তা যেখানে শোকজের চিঠি জেলায় পাঠানোর কথা জানিয়েছেন, সেখানে ইউএনও বিষয়টি যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।

ফ্যামিলি কার্ড দরিদ্র পরিবারের জন্য সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ। এই কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে টাকা দাবির অভিযোগ ওঠা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে একজনের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন, স্বামীর বিরুদ্ধে টাকা দাবির অভিযোগ এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের পরও নিয়োগের বৈধতা নিয়ে ধোঁয়াশা সব মিলিয়ে বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি রাখে।

এখন দেখার বিষয়, সরকারের এই মহৎ উদ্যোগকে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কেউ অনিয়মের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন কি না, প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষভাবে তা তদন্ত করে এবং দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাংগঠনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয় কি না।

স্থানীয়দের দাবি, বর্ণা রানী সরকারের নিয়োগের বৈধতা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব থেকে বিরত রাখতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর নিয়োগ বাতিল ও চাকরিচ্যুতির বিষয়ে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সরকারের বিরুদ্ধে টাকা দাবির অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে তাঁকে বিএনপির ওয়ার্ড সভাপতির পদ থেকে বহিষ্কারসহ আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি চূড়ান্ত তালিকায় থাকা জুয়েল চন্দ্র দাসের নিয়োগ না হওয়ার কারণও প্রকাশ করতে হবে।

দরিদ্র মানুষের অধিকার নিয়ে কোনো ধরনের বাণিজ্য বা রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ যেন তৈরি না হয় এটাই এখন এলাকাবাসীর প্রত্যাশা।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :