সাতক্ষীরা জলাবদ্ধতায় ডুবছে কৃষি অনাবাদি সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমি
- আপডেট সময় : ১০:৩০:০৯ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ২৯ বার পড়া হয়েছে
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলায় সাড়ে ১২ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ করা যায়নি। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন অন্তত ২৫ থেকে ৩০ হাজার কৃষক। দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় একদিকে যেমন কৃষিজমি অনাবাদি পড়ে থাকছে, অন্যদিকে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়ছে উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ, জীববৈচিত্রও জনস্বাস্থ্য।
পরিবেশ ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, অতিবৃষ্টি, নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস, পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামোর মতো বিষয় উপকূলীয় এলাকায় জলাবদ্ধতার সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। এর ফলে সাতক্ষীরার বিস্তৃণ কৃষিজমি ক্রমেই চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
জেলার অন্যতম ফসলী বিল তালা উপজেলার শাকদাহ। এ বিলের বিস্তৃর্ণ এলাকাজুড়ে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। এই বিলের কৃষক সোহরাব হোসেন ও গোবিন্দ দাশ জানান, জলাবদ্ধকার কারনে গত ৮ থেকে ১০ বছর যাবত তারা আমন ধান চাষ করতে পারেননা। অথচ এক দশক আগেও তাদের ওই জমিতে প্রচুর পরিমান আমন ধান উৎপাদন হয়েছে শাকদাহ বিলে। বর্তমানে সেই বিলে এখন হাজার হাজার কৃষক আমন চাষ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বছরে শুধু বোরো ধান চাষ করা ছাড়া অন্য কোনো ফসল উৎপাদন করা যাচ্ছে না বলে জানান তারা। তাছাড়া জলাবদ্ধতার কারনে গবাদীপশু কমে যাচ্ছে এলাকায়। বিলের উন্মুক্ত চারনভুমি পানিতে থাকায় ছাগল, গরু ও মহিষ হারিয়ে যেতে বসেছে বলেও জানান তারা।
শুধু শাকদাহ বিলেই নয়, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী উপকূলীয় সাতক্ষীরার ৫টি উপজেলাতে ১২ হাজার ৬৮৫ হেক্টর কৃষি জমি স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। এরমধ্যে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ৩ হাজার ৭৩০ হেক্টর, কলারোয়ায় ১ হাজার ৩৬০ হেক্টর, তালা উপজেলায় ৭ হাজার ৬৫ হেক্টর, আশাশুনি উপজেলায় ৪৫০ হেক্টর এবং শ্যামনগরে ৮০ হেক্টর।
কৃষক আন্দোলন কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক অধ্যক্ষ আশেক-এলাহী জানান, সাতক্ষীরার দুর্যোগ পরিস্থিতি এখন আর নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমে সীমাবদ্ধ নেই। অতিবৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস, নদীভাঙন ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার মতো দুর্যোগে বছরের বিভিন্ন সময়ে বিপর্যস্থ হচ্ছে জনজীবন। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, মৎস্য, গবাদিপশু পালন, বসতবাড়ি ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়। তিনি বলেন, এই ভয়াবহ জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে হলে নদী ও খাল পুর্নখনন করা অতি জরুরী। তিনি বলেন, বিলের মধ্যে যে সমস্ত সরকারী খাল রয়েছে তা সাধারণ কৃষকদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। তিনি এসব খাল দীর্ঘদিন এক শ্রেণীর প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছে। ফলে বিলে এখন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক ইকবাল আহমেদ বণিক বার্তাকে জানান, সাতক্ষীরার অর্থনীতি ও গ্রামীণ জনজীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। আমন ধান এ অঞ্চলের কৃষকদের গুরুপূর্ণ মৌসুমি ফসল। কিন্তু জমিতে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় সময়মতো চারা রোপণ ও চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কৃষকরা শুধু একটি মৌসুমের উৎপাদন থেকেই বঞ্চিত হচ্ছেন না, তাঁদের বীজ, সার, শ্রম ও জমি প্রস্তুতের ব্যয়ও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। তবে গত বছর কিছু খাল পুনর্নখনের ফলে চলতি মৌসুমে আমন প্রায় সাড়ে ৪‘শ হেক্টর আবাদ বেড়েছে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনা বিভাগীয় উপ-পরিচালক সরদার শরিফুল জানান, জলাবদ্ধতার প্রভাব শুধু কৃষিজমিতে সীমাবদ্ধ নয়। বসতবাড়ি ও চলাচলের পথ দীর্ঘদিন পানিতে ডুবে থাকলে নিরাপদ পানি সংগ্রহ, পয়োনিষ্কাশন এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। স্থির ও দূষিত পানির সংস্পর্শে চর্মরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় গাছপালা, জলজ উদ্ভিদ, দেশীয় মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এক্ষেত্রে নদী ও খালের নাব্যতা বৃদ্ধিতে সরকারের মহাপরিকল্পনা গ্রহন করা প্রয়োজন। তা না হলে দ্রুত যে ভাবে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে তাতে করে ক্রমাম্বয়ে জলাবদ্ধতায় গ্রাস করবে কৃষিজমি।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট সাতক্ষীরা কার্যালয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শিমুল মন্ডল জানান, জলাবদ্ধতার কারণ নির্ধারণে এলাকাভিত্তিক পানি প্রবাহ ও নিষ্কাশনব্যবস্থা নিয়ে বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার পাশাপাশি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় উপযোগী ফসলের জাত, বিকল্প চাষাবাদ পদ্ধতি, কৃষি পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের সহায়তা জোরদার করা দরকার। এছাড়াও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এবং গবাদিপশু ও জীববৈচিত্র রক্ষায়ও এক্ষনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করতে।




















