দিনাজপুর বোর্ডে পাসের হারে তলানিতে পঞ্চগড়, ৪ প্রতিষ্ঠানে সবাই ফেল
- আপডেট সময় : ১১:১৪:১৯ অপরাহ্ণ, রবিবার, ১ নভেম্বর ২০২৬ ২৮ বার পড়া হয়েছে
মাজেদুল ইসলাম আকাশ, পঞ্চগড় প্রতিনিধি : দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জেলা-ভিত্তিক ফলাফলে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটেছে পঞ্চগড়ে। বোর্ডের অধীন আটটি জেলার মধ্যে মাত্র ৩৬.২৩ শতাংশ পাসের হার নিয়ে তালিকার সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে সীমান্তঘেরা এই জেলা। অন্যদিকে, ৫৬.১২ শতাংশ পাসের হার নিয়ে তালিকার শীর্ষে রয়েছে রংপুর জেলা। শীর্ষে থাকা রংপুরের সঙ্গে সর্বনিম্ন পঞ্চগড়ের পাসের হারের ব্যবধান প্রায় ১৯.৮৯ শতাংশ পয়েন্ট। চলতি বছরের এমন হতাশাজনক ফলাফল জেলার সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার মান, পাঠদান কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্ন ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের জেলা-ভিত্তিক পাসের হারের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, রংপুরে পাসের হার ৫৬.১২ শতাংশ, নীলফামারীতে ৪৯.৯২ শতাংশ, লালমনিরহাটে ৪৬.৭১ শতাংশ, ঠাকুরগাঁওয়ে ৪৫.০৩ শতাংশ, দিনাজপুরে ৪৩.৮২ শতাংশ, কুড়িগ্রামে ৪০.৭২ শতাংশ, গাইবান্ধায় ৩৮.৮০ শতাংশ এবং পঞ্চগড়ে ৩৬.২৩ শতাংশ।
এ দিকে ২০২৬ সনের এইসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পঞ্চগড় জেলা থেকে মোট ৬ হাজার ৯৯৩ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে পাস করেছেন মাত্র ২ হাজার ৫২৬ জন এবং জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৫১ জন শিক্ষার্থী; যা আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেকটাই নিম্নমুখী।
জেলাজুড়ে সামগ্রিক ফলাফলের এই ধসের মধ্যে সবচেয়ে বড় লজ্জাজনক চিত্র দেখা গেছে দেবীগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজে। বিশাল নান্দনিক বহুতল ভবন, অত্যাধুনিক ল্যাব ও কারিগরি শিক্ষার প্রসারে বিপুল সরকারি অর্থ বিনিয়োগ থাকা সত্ত্বেও পাসের খাতা খুলতে পারেনি এই প্রতিষ্ঠানটি। চলতি বছরের এইচএসসি ভোকেশনাল পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির ইলেকট্রিক্যাল ওয়ার্কস অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স ট্রেড থেকে ১২ জন এবং ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল অ্যান্ড কমিউনিকেশন ট্রেড থেকে ১ জনসহ মোট ১৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। ফলাফলে দেখা গেছে, পরীক্ষায় অংশ নেয়া ১৩ শিক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হয়েছেন।
ফলাফল বিপর্যয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে দেবীগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোস্তফা কামাল বলেন, “আমি চলতি বছরের মে মাসে এখানে যোগদান করেছি। যোগদানের মাত্র এক এক মাস পরেই পরীক্ষা শুরু হয়ে যায়। এই ফলাফলের পেছনে মূল কারণ ছিল তীব্র শিক্ষক সংকট। আমাদের প্রতিষ্ঠানে মোট ৪৬টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৭ জন শিক্ষক।”
দেবীগঞ্জ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ ছাড়াও জেলার আরও তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শতভাগ ফেলের ঘটনা ঘটেছে। জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, বোদা পাইলট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ৮ জন, একই উপজেলার ঝলইশালশীরি একরামিয়া আলিম মাদ্রাসা থেকে ৫ জন এবং তেঁতুলিয়ার আলহাজ্ব তমিজ উদ্দিন কলেজ থেকে ২ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিলেও তাদের কেউই পাস করতে পারেনি। সব মিলিয়ে জেলার মোট চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাসের মুখ দেখেনি। সরকারের এত বড় বিনিয়োগ ও বিপুল সুযোগ-সুবিধার বিপরীতে এমন বিপর্যয়কর ফলাফলে স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এ বিষয়ে পঞ্চগড় জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি, সেগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি ও ব্যর্থতার কারণ গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে যদি প্রাতিষ্ঠানিক কোনো গাফিলতি বা দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শুধু পাসের হারের পরিসংখ্যান দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক চিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে এ ফলাফল জেলার শিক্ষার মানোন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানপ্রধান, শিক্ষক ও অভিভাবকদের নতুন করে ভাবার বড় সুযোগ তৈরি করেছে। পঞ্চগড়ের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ভালো ফলাফল নিশ্চিত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়ানো, বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা চিহ্নিত করে বিশেষ নজরদারি এবং শিক্ষা প্রশাসনের কার্যকর তদারকি বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

















