ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের স্মারক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাড়ি রক্ষায় রাজপথে নামার ঘোষণা এনসিপির
- আপডেট সময় : ০৮:২৯:২৫ অপরাহ্ণ, শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬ ২০ বার পড়া হয়েছে
কুমিল্লা প্রতিনিধি : ভাষা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ও শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বাসভবন বিক্রির অপচেষ্টা বন্ধ করে বাড়িটি সরকারি উদ্যোগে অধিগ্রহণ ও জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), কুমিল্লা মহানগর শাখা।
শুক্রবার ৬ নভেম্বর গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে এ দাবি জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, কুমিল্লা শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ জনপদ। এ অঞ্চলের মাটি শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, শচীন দেববর্মণ, কাজী নজরুল ইসলাম ও নবাব ফয়জুন্নেসার মতো কালজয়ী ব্যক্তিত্বের স্মৃতিবিজড়িত। তাঁদের অবদান কুমিল্লার ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। বিশেষ করে ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাঙালির ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা করেন।
বিবৃতিতে জানায়, ১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার রামরাইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। পেশায় আইনজীবী ও সমাজকর্মী এই বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য এবং পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তাঁর ঐতিহাসিক সংশোধনী প্রস্তাব পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী প্রত্যাখ্যান করে। এর ফলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রেরণা হয়ে ওঠে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ২৯ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কুমিল্লা শহরের নিজ বাসভবন থেকে ৮৪ বছর বয়সী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ও তাঁর ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়। ময়নামতি সেনানিবাসে তাঁদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। এরপর তাঁদের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে তাঁকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।
বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, কুমিল্লার অন্যান্য কীর্তিমান ব্যক্তিত্বের স্মৃতিবিজড়িত সম্পদ তাঁদের উত্তরসূরিরা শ্রদ্ধার সঙ্গে সংরক্ষণ করে আসছেন। অথচ শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বাড়িটি নিয়ে বেচাকেনার অপচেষ্টা অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
সংগঠনটির অভিযোগ, সাবেক সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আরমা দত্ত নিজেকে ওই বাড়ির ওয়ারিশ দাবি করে ঐতিহাসিক বাড়িটি বিক্রির উদ্যোগ নিচ্ছেন। বিষয়টিকে জাতীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জন্য আশঙ্কাজনক উল্লেখ করে এনসিপি বলেছে, ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিধন্য এই বাসভবনকে কেবল ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। এটি জাতির ইতিহাস, আত্মত্যাগ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।
এনসিপি কুমিল্লা মহানগর শাখা স্পষ্টভাবে জানায়, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিবিজড়িত এই ঐতিহাসিক বাড়ি কোনোভাবেই বিক্রি বা হাতবদল হতে দেওয়া যাবে না। বাড়িটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিবৃতিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী আমিনুর রশীদ ইয়াসিন, কুমিল্লা-৬ আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুল হক চৌধুরী, কুমিল্লার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জেলা আইন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট স্থানীয় ও জাতীয় কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
একই সঙ্গে শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ঐতিহাসিক বাসভবনটি অবিলম্বে সরকারি উদ্যোগে অধিগ্রহণ, প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জোর দাবি জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতি রক্ষা করা মানে শুধু একটি পুরোনো বাড়ি রক্ষা করা নয়; বরং ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং বাঙালির আত্মপরিচয়ের গৌরবময় ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অক্ষুণ্ন রাখা।
বিবৃতিতে এসব দাবি জানান জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), কুমিল্লা মহানগর শাখার সদস্য সচিব মাসুমুল বারী কাওসার।



















