প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর — ভিভিআইপি ফ্লাইটে বিতর্কিতদের হাতে দায়িত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা কতটা সুরক্ষিত?
- আপডেট সময় : ১১:৫২:৪৭ অপরাহ্ণ, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৫ বার পড়া হয়েছে
*মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিক তালুকদার*
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের মতো বিষয়গুলো এই সফরের সঙ্গে জড়িত। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফরের প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, নিরাপত্তা এবং স্বচ্ছতা থাকা অপরিহার্য। কিন্তু এই সফরকে কেন্দ্র করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভিভিআইপি ফ্লাইট পরিচালনায় দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে যে তথ্য সামনে এসেছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
সংবাদ পত্রের বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিজি-৩৭৬ ঢাকা থেকে নারিতা এবং ফিরতি বিজি-৩৭৭ নারিতা থেকে ঢাকা ফ্লাইটের কারিগরি দায়িত্বের তালিকায় এমন একজন প্রকৌশলীর নাম রয়েছে, যার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা বিচারাধীন রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ সালে মিশরীয় উড়োজাহাজ সংস্থা ইজিপ্ট এয়ার থেকে দুটি বোয়িং উড়োজাহাজ লিজ নেয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের মাধ্যমে রাষ্ট্রের শত কোটি টাকা ক্ষতির অভিযোগে ২০২৩ সালে মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলাটি বর্তমানে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি জামিনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
বিমানের অভ্যন্তরীণ নথি এবং ই-মেইল সূত্রে আরও জানা যায়, ওই কর্মকর্তা অতীতে বিমানের প্রভাবশালী একটি চক্রের আনুকূল্যে হজ ফ্লাইট, যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং গ্রহণ এবং ইতালি ও চীনে ডি-চেকের মতো লোভনীয় বিদেশ সফরে বারবার অগ্রাধিকার পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই তালিকায় এমন একজন কর্মকর্তার নামও আলোচনায় এসেছে, যিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শ্রমিক লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এখানেই প্রশ্ন, একটি ভিভিআইপি ফ্লাইট কি সাধারণ বাণিজ্যিক ফ্লাইটের মতো? মোটেও নয়। প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী ফ্লাইটের সঙ্গে সরাসরি তিনটি বিষয় জড়িত — এক. জাতীয় নিরাপত্তা, দুই. কূটনৈতিক মর্যাদা, তিন. রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি। এই তিনটি বিষয়ের কোনোটিতেই আপস করার সুযোগ নেই। এমন স্পর্শকাতর দায়িত্বে কাকে রাখা হবে, তার জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কঠোর নিরাপত্তা ছাড়পত্র, গোয়েন্দা যাচাই এবং অতীত কর্মকাণ্ডের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক। বিচারাধীন মামলার আসামি বা রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ব্যক্তিকে এমন দায়িত্বে রাখা হলে তা শুধু নিরাপত্তা প্রোটোকলকেই দুর্বল করে না, বরং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থাকেও নড়বড়ে করে দেয়।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যথার্থই বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি ফ্লাইট সাধারণ ফ্লাইট নয়। এর সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি জড়িত। এ ধরনের দায়িত্বে নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগ্যতা ও অতীত কর্মকাণ্ড যাচাই এবং নিরাপত্তা প্রক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। বিতর্কিত ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিলে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এই বিতর্কের মধ্যেই আরও দুটি ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রথমত, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের ঠিক আগে জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলীকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত। একজন রাষ্ট্রদূতই হলেন সফরের প্রধান সমন্বয়ক। সফরের প্রাক্কালে তাকে সরিয়ে নেওয়া এবং ভিভিআইপি ফ্লাইটের দায়িত্ব বণ্টনে অস্বচ্ছতা — দুটি ঘটনা একসঙ্গে দায়িত্ব বণ্টনের মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুতর ঘটনা হলো, জাপান থেকে ফেরার দিন বিজি-৩৭৭ ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি। জাপানের স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় ফ্লাইটটির উড্ডয়নের কথা থাকলেও যান্ত্রিক সমস্যার কারণে তা বিলম্বিত হয়। ক্রু এবং প্রকৌশলীরা ত্রুটি সারাতে কাজ করছেন বলে জানানো হলেও কী ধরনের ত্রুটি, কখন তা শনাক্ত হলো, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনো জনসমক্ষে আসেনি। দেশের সরকার প্রধানকে বহনকারী উড়োজাহাজে এমন ত্রুটি কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
আমরা মনে করি, এই ঘটনা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাপনার সংকটকেই সামনে নিয়ে এসেছে। অতীতে লিজ, কেনাকাটা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ বারবার উঠেছে। একটি জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা যখন প্রধানমন্ত্রীকে বহন করে, তখন তার রক্ষণাবেক্ষণ ইতিহাস, প্রকৌশল ব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের পেশাদারিত্ব নিয়ে শতভাগ নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
এ অবস্থায় আমাদের সুস্পষ্ট দাবি —
১. প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি ফ্লাইটে দায়িত্বপ্রাপ্ত সকলের নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা জনসমক্ষে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
২. ফিরতি ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনায় একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কারিগরি তদন্ত কমিটি গঠন করে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে।
৩. বিচারাধীন মামলার আসামি বা বিতর্কিত কর্মকর্তাদের ভিভিআইপি দায়িত্ব থেকে বিরত রেখে একটি স্থায়ী ভিভিআইপি ফ্লাইট পুল গঠন করতে হবে, যেখানে শুধুমাত্র ক্লিন রেকর্ড এবং সর্বোচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মকর্তারাই থাকবেন।
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা মানে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা। এখানে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা আশা করি, সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং ভবিষ্যতে ভিভিআইপি ফ্লাইট পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।
_ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক বাংলাপোষ্ট ও সভাপতি ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলন_






















