পরিবারের স্বপ্ন পূরণ হলো না, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রাণ গেল সাগরে
- আপডেট সময় : ০৮:৪১:০৯ অপরাহ্ণ, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ ১৪ বার পড়া হয়েছে
কুমিল্লা প্রতিনিধি : পরিবারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার তরুণ মো. সাগর (২৪)। একটি বেকারিতে কাজ করে মাসে প্রায় ৭০ হাজার টাকা আয় করতেন তিনি। কিন্তু বেশি উপার্জনের আশায় এক বাংলাদেশি দালালের প্রলোভনে জড়িয়ে পড়েন রুশ সেনাবাহিনীতে। এরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে প্রাণ হারান সাগর। তবে তাঁর মৃত্যুর চার থেকে পাঁচ মাস পর সহযোদ্ধার ফোনে সেই দুঃসংবাদ জানতে পারে পরিবার। এখন শোকের ভার বুক নিয়ে সন্তানের মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন কাটছে স্বজনদের।
নিহত সাগর চান্দিনা পৌরসভার ছায়কোট এলাকার বাসিন্দা। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। অভাবের সংসারে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে এক সময় বাবার সবজি ব্যবসায় সহযোগিতা করতেন। কখনো চালাতেন রিকশাভ্যান। পরিবারের আর্থিক অনটন দূর করে সবার মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্নই তাঁকে বিদেশে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ করে রাশিয়ায় যান সাগর। সেখানে একটি বেকারিতে কাজ করতেন তিনি। মাসে আয় করতেন প্রায় ৭০ হাজার টাকা। একপর্যায়ে তাঁর পরিচয় হয় এক বাংলাদেশি দালালের সঙ্গে। ওই দালাল তাঁকে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে বেশি অর্থ উপার্জনের সুযোগ পাওয়া যাবে বলে প্রলোভন দেখান।
পরিবারের সদস্যরা তাঁকে এমন সিদ্ধান্ত না নেয়ার জন্য নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁদের আপত্তি উপেক্ষা করে চলতি বছরের মে মাসে যুদ্ধে অংশ নিতে যান সাগর। এরপর থেকেই পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটছিল পরিবারের সদস্যদের। দীর্ঘ চার থেকে পাঁচ মাস কোনো খোঁজ না পেয়ে স্বজনেরা উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিলেন। অবশেষে গত শনিবার এক সহযোদ্ধার ফোনে সাগরের মৃত্যুর খবর পান তাঁরা।
তবে কী পরিস্থিতিতে সাগরের মৃত্যু হয়েছে, কোথায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে কিংবা তাঁর মরদেহ বর্তমানে কোথায় রয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো পরিবারের কাছে নেই। মৃত্যুর খবর পেলেও ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি স্বজনেরা।
ছেলের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন মা-বাবা।
সাগরের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। অসুস্থ বাবা কবির হোসেন ও মা দেলোয়ারা বেগম ছেলের মৃত্যুসংবাদে ভেঙে পড়েছেন। ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তাঁরা। আশা ছিল, সাগরের উপার্জনে পরিবারের আর্থিক সংকট দূর হবে, সংসারে ফিরবে সচ্ছলতা।
কিন্তু পরিবারের সেই স্বপ্ন আজ গভীর শোকে পরিণত হয়েছে। যে ছেলের উপার্জনে সংসারের অভাব ঘোচানোর আশা করেছিলেন মা-বাবা, সেই ছেলের মৃত্যুর খবর তাঁদের অসহায় করে দিয়েছে। পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরাও এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন।
সাগরের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনেরা। পরিবারের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিয়ে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করবে। শেষবারের মতো সন্তানের মুখ দেখতে চান শোকাহত মা-বাবা।
এদিকে কীভাবে সাগর রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিলেন, কোন বাংলাদেশি দালালের মাধ্যমে তিনি যুদ্ধে জড়ালেন এবং তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি কীভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা যাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। একই সঙ্গে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে কি না, তা নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছে পরিবারটি।
এ বিষয়ে চান্দিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল হক জানান, সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি জানার পর তিনি খোঁজখবর নিচ্ছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা চাওয়া হলে প্রয়োজনীয় সহায়তা করা হবে।
পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন সাগর। চেয়েছিলেন অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে, মা-বাবার কষ্ট দূর করতে। কিন্তু যুদ্ধের ময়দান থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর এসে সেই স্বপ্নকে থামিয়ে দিয়েছে। এখন সন্তান হারানোর অসহনীয় শোকের পাশাপাশি মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের। শোকাহত মা-বাবার একটাই আকুতি—শেষবারের মতো যেন তাঁদের সন্তানের মুখ দেখতে পারেন।




















