দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষা ছাড়া বেকারত্ব দূর করা সম্ভব নয় : পিএসসি সদস্য
- আপডেট সময় : ০৯:৪৩:৫৫ অপরাহ্ণ, রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬ ১১ বার পড়া হয়েছে
কুমিল্লা প্রতিনিধি : শুধু একাডেমিক সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষা দিয়ে বর্তমান শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস। তিনি বলেছেন, বেকারত্ব দূর করতে একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর সংযোগ তৈরি করা জরুরি।
রবিবার ৪ অক্টোবর কুমিল্লা টাউন হল মাঠে কুমিল্লা জেলা কারিগরি, ভোকেশনাল শিক্ষা ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউশন ফোরাম (টিভিইটি) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী কারিগরি শিক্ষা ও উদ্ভাবনী মেলার সমাপনী দিনে আয়োজিত সেমিনারে তিনি এ সব কথা বলেন। ‘কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়ন, পেশাগত স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি প্যানেল স্পিকার হিসেবে বক্তব্য দেন।
ড. সায়মা ফেরদৌস বলেন, বর্তমানে কারিকুলাম তৈরির ক্ষেত্রে একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের ওপর বেশি নির্ভরতা রয়েছে। ফলে একাডেমিক শিক্ষা ও ব্যবহারিক খাতের মধ্যে একটি অসামঞ্জস্য থেকে যাচ্ছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা ও শিক্ষার্থীদের অর্জিত দক্ষতার মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা দূর করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের যুগে আমাদের কারিকুলামও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। গতানুগতিক ধারায় চিন্তা করলে চলবে না।’
শিক্ষার্থীদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দিয়ে পিএসসি সদস্য বলেন, শিক্ষাজীবন থেকেই শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কাজের সুযোগ দিতে হবে। তিন দিন শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি বাকি সময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বাস্তব কাজ শেখানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করার আগেই কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে।
তিনি বলেন, ‘অনেক শিক্ষার্থী একাডেমিক শিক্ষা নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রি কোলাবোরেশন না থাকায় চাকরিতে গিয়ে তাকে আবার দীর্ঘ সময় ধরে কাজ শিখতে হয়। তখন তার অভিজ্ঞতা না থাকার বিষয়টি সামনে আসে।শিক্ষাজীবনেই যদি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ শেখার সুযোগ দেয়া যায়, তাহলে এই সমস্যা অনেকটাই দূর হবে।’
কারিগরি শিক্ষায় ইন্ডাস্ট্রি লিংকেজ বাধ্যতামূলক করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীর শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ না থাকলে তার শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এ সুযোগ রাষ্ট্রকেই তৈরি করে দিতে হবে। পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর প্রসঙ্গে ড. সায়মা ফেরদৌস বলেন, বাংলাদেশ থেকে এখনো বিপুলসংখ্যক স্বল্পদক্ষ শ্রমিক বিদেশে যাচ্ছে। ফলে তারা যথাযথ মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। দক্ষ শ্রমিক তৈরি করে বিদেশে পাঠাতে পারলে বাংলাদেশের কর্মীরা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে অধিক মূল্যায়িত হবেন এবং বৈদেশিক রেমিট্যান্সও বাড়বে।
সেমিনারে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষ ইঞ্জিনিয়ার শাখাওয়াত আলী বলেন, প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে কয়েক বছর আগের কারিকুলাম দিয়ে বর্তমান প্রযুক্তির যথাযথ শিক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। শুধু একাডেমিক জ্ঞানের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা বৃদ্ধির দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
সাবেক সচিব ও ডেসকো চেয়ারম্যান সানোয়ার জাহান ভুঁইয়া বলেন, শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নিরূপণ করতে হবে। কারণ বর্তমানের পদ্ধতি ভবিষ্যতে কার্যকর নাও হতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের লিংকেজ বাড়ানো গেলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে উৎপাদনমুখী সম্ভাবনার সমন্বয় ঘটবে।
তিনি বলেন, দক্ষতার ঘাটতির কারণে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে বেকারত্ব কমানো সম্ভব। অন্যদিকে বেকারত্ব বাড়তে থাকলে মাদকাসক্তি, নৈতিক অবক্ষয়সহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম বলেন, কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে সবার আগে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষার সমন্বয়ে একটি সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পলিটেকনিকের ডিপ্লোমা কোর্স শেষ করলেই শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেট দেওয়া হচ্ছে; কিন্তু তারা বাস্তবে কতটা দক্ষতা অর্জন করেছে, সেটি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ থাকলে শিক্ষার্থীরা তাদের একাডেমিক জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগ পাবে।
ড. এম এম শরীফুল করীম আরও বলেন, ডিপ্লোমা ও বিএসসি ডিগ্রির মধ্যে মূল পার্থক্য হলো—ডিপ্লোমায় তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত সিলেবাস এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে বিস্তারিত সিলেবাস পড়ানো হয়। তবে অনেক ডিপ্লোমাধারী সরাসরি চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন। এ ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এবং বৈষম্য তৈরি হয়। তাই পুরো ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।
সেমিনারে প্যানেল স্পিকার হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন পিএসসি সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম, সাবেক সচিব ও ডেসকো চেয়ারম্যান সানোয়ার জাহান ভুঁইয়া এবং ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষ ইঞ্জিনিয়ার শাখাওয়াত আলী। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন সিসিএন শিক্ষা পরিবারের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ড. তারিকুল ইসলাম চৌধুরী।
উল্লেখ্য, তিন দিনব্যাপী কারিগরি শিক্ষা ও উদ্ভাবনী মেলা গত শুক্রবার কুমিল্লা টাউন হল মাঠে শুরু হয়।




















